যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

লাতিন আমেরিকান বিপ্লবী কবি পাবলো নেরুদা ও তার কবিতা শংকর ব্রহ্ম

 
story and article

“আমরা অর্থাৎ ভবঘুরে কবিরা পৃথিবী চষে বেড়িয়েছি, খুঁজেছি তাকে—

জীবন আমাদের স্বাগত জানিয়েছে—

প্রতিটি দরজায় দরজায়—

মাটি-কাদা-জলের সংগ্রামে’’

— এমন করে লিখেছেন যে কবি, তিনিই পাবলো নেরুদা।

বাঙালী পাঠক ও কবিদের কাছে নেরুদার নাম অজানা নয়। অনেকেই জানেন।

চিলির এই বিপ্লবী কবির কবিতার অনুবাদ এবং তাঁর কবিতার জগৎ সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরী করার ভূমিকা মাত্র নিবন্ধটি।

আজ লাতিন আমেরিকার ও হিস্পানি ভাষার অন্যতম প্রধান কবি পাবলো নেরুদা।

তিনি ১২ই জুলাই ১৯০৪ সালে দক্ষিণ চিলির এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। আর মারা যান ২৩শে সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ সালে, মাত্র ৬৯ বছর বয়সে।

তিনি জন্মেছিলেন যে নাম নিয়ে, তা ছিল বেশ দীর্ঘ—রিকার্দো এলিয়েসের নেফতালি রেইয়েস বাসোয়ালতো। পরে লেখক হিসেবে তিনি পাবলো নেরুদা নামটি গ্রহণ করেন।

চেকোস্লাভাকিয়ার উনিশ শতকের প্রধান ও প্রভাবশালী কবি ও সাংবাদিক ‘ইয়ান নেরুদা’-কে স্মরণ, সম্মান ও অনুসরণ করেই তিনি সেই নামটি বেছে নিয়েছিলেন। নেরুদার জীবন ছিল নিঃসন্দেহে এক মহাকাব্যিক বিস্তারের অভিযাত্রা, যার বৈচিত্র্য ও প্রসার এই সংক্ষিপ্ত ভূমিকায় ধরা মোটেই সম্ভব নয়। তবে নেরুদার যে তিনটি কবিতার অনুবাদ এখানে দেওয়া হয়েছে, সেগুলোকে বিশেষভাবে বিবেচনায় রেখেই তাঁর জীবন ও কাজের গুটিকয়েক দিককে স্পর্শ করাই হবে এই ভূমিকার উদ্দেশ্য।

১৯৭১ সালে সাহিত্যে নোবেল পাওয়া পাবলো নেরুদা মূলত প্রেমের কবি হিসেবে দুনিয়াজুড়ে পরিচিত। তাঁর অসাধারণ প্রেমের কবিতার কারণেই তিনি ২০ শতকের সর্বাধিক অনূদিত কবি, যদিও সম্প্রতি এ-ও বলা হচ্ছে, সব ভাষায় তাঁর সব কবিতা এখনো অনূদিত হয়নি। আর যাকে ‘বিশ্বসাহিত্য’ বলা হয়, তার ইতিহাসে যেসব কবিতাকে সচরাচর ‘কালোত্তীর্ণ’ ও ‘মহৎ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে, তাদের অধিকাংশই প্রেমের কবিতা। তবে প্রেমের কবিতারও রকমফের থাকে, যার প্রমাণ নেরুদার নিজের কাজেই মেলে। তাঁর কবিতায় আন্দোলিত বা এমনকি উন্মাদ প্রেমিক কর্তাসত্তা যেমন লিরিকের ঘনিষ্ঠ—এমনকি ভীষণ আবেগপ্রবণ

— উচ্চারণে হাজির থাকে, তেমনি নেরুদা এমন কবিতাও আমাদের উপহার দিয়েছেন, যেখানে প্রেম একদিকে নির্দিষ্ট সময় ও দূরত্বকে ধারণ করে মানুষের সম্পর্ককে উৎসাহে উদযাপন করে এবং অন্যদিকে সেই প্রেম বিরাজমান অবস্থা ও ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে অনিবার্য করে তোলে। অন্য কথায়, নেরুদার কবিতায় প্রেমও হয়ে ওঠে তুমুলভাবে বৈপ্লবিক।

ঊনসত্তর বছরের জীবনে নেরুদা অসংখ্য কবিতা লিখেছেন। কবিতার বিচিত্র ফর্ম নিয়েও তিনি বিস্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তাঁর অনেক কবিতায় লিরিকের ‘আমি/তুমি’ সম্পর্ক যেমন আছে, তেমনি সেই সম্পর্ক রূপান্তরিত হয়েছে মহাকাব্যিক সমষ্টিতেও। আর এই রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় নেরুদার কবিতায় মূখ্য হয়ে উঠেছে সর্বসাধারণের পক্ষাবলম্বন করে অন্যায়-অবিচার-অত্যাচারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ। এতে কবিতার নান্দনিক গুণও অক্ষুণ্ন থেকেছে । নিজেতে-নিজে-ফুরানো কলাকৈবল্যবাদ ও তথাকথিত শুদ্ধতাবাদকে নেরুদা সরাসরি চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং বলে উঠেছিলেন: – ‘চাই সেই কবিতা যা একই সঙ্গে ঘাম আর ধোঁয়ায় ঠাসা, যা একই সঙ্গে ফুল আর প্রস্রাবের গন্ধভরা, যা আমাদের পরিহিত পোষাকের মতোই অশুচি কিংবা আমাদের দেহের মতোই দূষিত।’

আসলে নেরুদা সেই কবিতার জন্য আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন যে কবিতায় পোড় খাওয়া সাধারণ মানুষের হাতের ছাপ দৃশ্যমান থাকে—সেই কবিতা যেখানে, নেরুদার নিজের ভাষায় , ‘দোআঁশ মাটি থাকে, যেখানে পানি গান গেয়ে যায়, সেই রুটির কবিতা যেখানে সকলেই খেতে পায়।’

নিজ প্রতিভাবলেই নেরুদা অবশ্য তাঁর আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি কবিতাকে দিয়েছিলেন এমন এক বাস্তুবতা, এমন এক জীবন ও প্রাণ যে, তাঁর দেশের কৃষক-শ্রমিক স্মৃতি থেকেই পথে-ঘাটে-মাঠে তাঁর কবিতার অসংখ্য লাইন বলে যেতে পারতেন।

একবার নেরুদা ট্রেনে চড়ে তাঁর শহর ছেড়ে গেছেন অন্য এক মফঃস্বল শহরে। সেখানে তিনি ট্রেন থেকে নামার আগেই জানালা দিয়ে লক্ষ্য করলেন শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষের ঢল। নেরুদাকে এক পলক দেখার জন্য এবং তাঁদের শহরে নেরুদাকে স্বাগত জানানোর জন্যও ওই সব মানুষ এসেছিলেন শুধু মালা নিয়ে নয়, তাঁরা এসেছিলেন তাঁদের স্মৃতিতে রাখা নেরুদার অবিনাশী কবিতা নিয়েও। অর্থাৎ শ্রমিকেরা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়েই নেরুদাকে শুনিয়েছিলেন নেরুদারই কবিতা!

নেরুদার জীবনীকারেরা এ-ও জানিয়েছেন, তাঁর কণ্ঠে কবিতাপাঠ শোনার জন্য মানুষের ঢল নামত এত প্রবলভাবে যে তাঁর কবিতাপাঠের জন্য রীতিমতো স্টেডিয়াম ভাড়া করতে হতো। একবার তাঁর কবিতা শোনার জন্য চিলির কোনো এক স্টেডিয়ামে জমায়েত ঘটেছিল কমপক্ষে ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষের। যথার্থ কারণেই আমাদের কবি কাজী নজরুল ইসলাম কিংবা উর্দু কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ কিংবা ফিলিস্তিন কবি মাহমুদ দারবিশের মতোই পাবলো নেরুদাও নন্দিত হয়েছিলেন ‘জনগণের কবি’ হিসেবে। আর তাঁকে ‘বিশ শতকের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি’ আখ্যা দিয়েছিলেন লাতিন আমেরিকার প্রধান ঔপন্যাসিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস।

নেরুদার অভিজ্ঞতা আর কবিতার বৈচিত্র্য, বিস্তার ও বৈভবকে বিবেচনায় রাখলে তাঁর কোনো দ্রুত ও একমাত্রিক চরিত্রায়ণ অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রেমের কবি ও জনগণের কবি বলা ছাড়াও তাঁকে বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে প্রতিবাদী কবি, বিদ্রোহী কবি, রাজনৈতিকভাবে লিপ্ত কবি প্রভৃতি। তবে নেরুদার নিজ ভাষ্য মোতাবেক, তিনি ‘কমিউনিস্ট’ ছিলেন। ১৯৪৫ সালে তিনি এমনকি চিলির কমিউনিস্ট পার্টিতেও যোগ দিয়েছিলেন। আর কমিউনিস্ট হওয়ার কারণেই রাজনৈতিক রোষানলে পড়ে তিনি নিজ বাসভূমে পরবাসী ও ছদ্মবেশে থেকে শেষ পর্যন্ত ১৯৪৯ সালে বাধ্য হয়ে গিয়েছিলেন বিদেশে, অর্থাৎ আর্জেন্টিনায়। বিশেষভাবে বলা দরকার, নেরুদা ছিলেন লাতিন আমেরিকার বিখ্যাত বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী ও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হওয়া চিলির ২৮তম প্রেসিডেন্ট (১৯৭০-১৯৭৩) সালভাদোর আয়েন্দের (১৯০৮-১৯৭৩) সমর্থক, ঘনিষ্ঠজন, কমরেড। আয়েন্দে ছিলেন সারা লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে জনগণের ভোটে প্রথম নির্বাচিত মার্ক্সবাদী প্রেসিডেন্ট। কিন্তু তিনি তিন বছরের বেশি টিকতে পারেননি, কেননা ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী সিআইএ ও চিলির সামরিক বাহিনী। আয়েন্দের ও গণতন্ত্রের মৃত্যুর ভেতর দিয়ে তারা পিনোশের একনায়কতন্ত্রকে জায়গা করে দিয়েছিল।

আয়েন্দের মৃত্যুর কারণ খুন না আত্মহত্যা,তা নিয়ে এখনো বিতর্ক আছে। তবে আয়েন্দের মৃত্যু নেরুদাকে দারুণভাবে আলোড়িত, বিষণ্ন ও শোকগ্রস্ত করে তুলেছিল। কমরেড আয়েন্দের মৃত্যুর মাত্র ১২ দিন পরই নেরুদাও মৃত্যুবরণ করেন। সাম্প্রতিক সময়ে আইনি কারণেই বেশ কিছু চিকিৎসাগত অনুসন্ধান এই জল্পনাও উসকে দিয়েছে, নেরুদার মৃত্যুও স্বাভাবিক ছিল না, বরং তাঁকে মেরে ফেলা হয়েছিল।

নেরুদা নিজেকে কমিউনিস্ট হিসেবে পরিচয় দিতে কুণ্ঠা বোধ করতেন না। সম্প্রতি ইংরেজি অনুবাদে প্রকাশিত বই ‘দ্য এজ অব দ্য পোয়েটস’-এ বর্তমান সময়ের একজন প্রধান দার্শনিক—এবং ফরাসি দার্শনিক—আল্যান বাদিউ নতুনভাবে কমিউনিস্ট কবি হিসেবে হাজির করেছেন পাবলো নেরুদাকে এবং এমনকি এই সাহসী ধারণাকেও সামনে এনেছেন যে চূড়ান্ত দৃষ্টান্তে কমিউনিজমের সঙ্গে কবিতার কোনো বিরোধ নেই, বরং তাদের রয়েছে স্বাভাবিক সম্পর্ক। নেরুদা নিজেও তা-ই মনে করতেন। এখানে আরও বলা দরকার, বিপ্লবী, গেরিলাযোদ্ধা, কমিউনিস্ট, কবি ও কবিতাপ্রেমী চে গুয়েভারার বুকপকেটে যাঁদের কবিতা থাকত, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন নেরুদা, যাঁকে আরেক কমিউনিস্ট কবি ও নেরুদার বন্ধু কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ বলেছিলেন ‘সর্বসাধারণের সাচ্চা প্রতিনিধি’ এবং ‘সময়ের দারুণ কণ্ঠস্বর’।

নেরুদা বহুপ্রজ কবি। তাঁর কবিতাসমগ্র বারবার মুদ্রিত হয়েছে। ১৯৫১ সালে তাঁর কবিতাসমগ্রের মোট পৃষ্ঠা ছিল ৮৫৯; ১৯৬২ সালে এসে সেই সংখ্যা দাঁড়াল ১,৯২৫-এ এবং ১৯৬৮ সালে ৩,২৩৭-এ। লেখক জ্যাকি ক্রেইভেনের দেওয়া সর্বশেষ হিসাব অনুসারে নেরুদার প্রকাশিত কবিতার পরিমাণ ৩৫ হাজার পৃষ্ঠা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তাঁর অসংখ্য কবিতা-সংকলনের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে (এখানে ইংরেজি অনুবাদেই তাঁর হিস্পানি কবিতার বইয়ের শিরোনামগুলো) : ‘টুয়েন্টি লাভ পোয়েমস অ্যান্ড আ সং অব ডেসপেয়ার’, ‘দ্য হাইটস অব মাচুপিচু’, ‘ওয়ান হানড্রেড লাভ সনেটস’, ‘দ্য ইয়েলো হার্ট’, ‘ক্যান্টো জেনারেল’, ‘স্পেইন ইন আওয়ার হার্টস’, ‘দ্য বুক অব কোয়েশ্চেনস’, ‘অন দ্য ব্লু শোর অব সাইলেন্স’, ‘ইনটিমেসিস: পোয়েমস অব লাভ’, ‘অল দ্য ওডস’ ও ‘বুক অব টোয়াইলাইট’।

নেরুদা যেমন বহুপ্রজ কবি ছিলেন, তেমনি তিনি বহু আঙ্গিকে, বিচিত্র বিন্যাসে ও ফর্মে কবিতা লিখেছেন। তবে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ফর্ম হচ্ছে ওড। সনেটও তাঁর প্রিয় ফর্ম। তাঁর কবিতা-সংকলন ‘এক শ প্রেমের সনেট’ নিঃসন্দেহে নেরুদার আঙ্গিকনৈপুণ্যের মোক্ষম উদাহরণ। কিন্তু সনেটের পরিমিতি ও ঘনত্বের নান্দনিকতা তাঁর প্রিয় হলেও নেরুদার কাছে তার চেয়েও বেশি প্রিয় ছিল ওডের স্থিতিস্থাপকতা, ব্যাপ্তি, বিস্তার, ব্যঞ্জনা, বহুমাত্রিকতা, বস্তুকতা আর অনিয়মিত কিন্তু ঢেউখেলানো ছন্দ।

আজীবনই নেরুদা ওড লিখেছেন। তবে বয়স পঞ্চাশ পেরোবার পর থেকেই তিনি ওড লেখার দিকে বিশেষভাবে ঝুঁকে পড়েছিলেন। নেরুদা সর্বমোট ২২৫টি ওড লিখেছিলেন এবং তাঁর জীবদ্দশায় তিনটি ভিন্ন সময়ে তিনটি আলাদা খণ্ডে তাঁর ওডগুলো প্রকাশিত হয়েছিল এবং সহজেই সাধারণ মানুষের ভালোবাসা অর্জন করতে পেরেছিল।

কিন্তু কী এই কাব্যরূপ যার নাম ওড? সংক্ষেপে এভাবে বলা যায়: ওড হচ্ছে এক ধরনের গাথাকবিতা, এক ধরনের স্তোত্রও, যা নিয়মিত ছন্দে যেমন লিখিত হয়েছে, তেমনি তা অনিয়মিত বা মুক্ত ছন্দেও লিখিত হয়েছে এবং যা কোনো বিশেষ ঘটনা, অভিজ্ঞতা, বস্তু বা এমনকি ব্যক্তিরও মহিমাকীর্তন করে থাকে। ওড লেখার ক্ষেত্রে যাঁরা নেরুদাকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলেন তাঁরা হলেন পিন্ডার, হোরেস, ওভিড, কাত্তুলাস, এমনকি হোমার এবং অবশ্যই কিটস্। তবে নেরুদা হিস্পানি ভাষায় এই ওডের শক্তি ও সম্ভাবনাকে সম্প্রসারিত করেছেন এমনভাবে যে তাঁর কবিতায় জগৎ, জীবন ও প্রকৃতি তাদের তাবৎ ঐশ্বর্য ও তাৎপর্য নিয়ে উপস্থিত ও উদ্ভাসিত হয়েছে আপাত-তুচ্ছ বিষয় ও বস্তুর অসাধারণ মহিমাকীর্তনের ভেতর দিয়ে।

নেরুদার ওড পড়তে গিয়ে মনে পড়ে যায় আমাদের বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কেই, যিনি হাল আমলের নিম্নবর্গের ইতিহাসতাত্ত্বিকদের আগেই এক অর্থে ‘জগতের লাঞ্ছিত-ভাগ্যাহত’-দের ইতিহাস লেখার ডাক দিয়েছিলেন এই বলে, ‘আরও সূক্ষ্ম, আরও তুচ্ছ জিনিসের ইতিহাস চাই। আজকের তুচ্ছতা হাজার বছর পরের মহাসম্পদ। মানুষ মানুষের বুকের কথা শুনতে চায়।’

এই ডাকটারই যেন উত্তর দিয়েছেন নেরুদা তাঁর ওডগুলোতে।

আমাদের বিভূতিভূষণকে না পড়েই যেন তাঁকেই টুকে দিয়েছেন এক প্রিয় গ্রীক কবি এবং নেরুদার সমসাময়িক—অদিসেয়াস এলিতিস। তিনি বলছেন: ‘তুচ্ছকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করো।’ নেরুদা যে সেটা করেছেন তা বলা যাবে নির্দ্বিধায়। আর পুঁজিতান্ত্রিক পণ্য-ব্যবস্থার যুগে আমাদের শৃঙ্খলিত ও এমনকি ভোঁতা হয়ে যাওয়া ইন্দ্রিয়কে মুক্ত ও জীবন্ত করার তীব্র তাগিদেই নেরুদা তাঁর ওডগুলোতে তুচ্ছ বিষয় যে তুচ্ছ নয়, সেই বোধ ও সত্যটাকে সঞ্চারিত করেছেন সুষমায়, সাংগীতিকতায়, আধ্যাত্মিকতায়, বস্তুকতায়, রাজনীতিকতায়—এমনকি সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিকতায়।

এই কারণে নেরুদার ওডগুলোতে বিষয় হিসেবে অনায়াসেই এসেছে মোজা কিংবা জুতা, ঝিলিক দেওয়া চায়ের পেয়ালা, কিংবা পেঁয়াজের কংক্রিট প্যাঁচ, কমলালেবুর অন্তর্গত সংহতি ও শিখা, লেবু ও লবণ, কৃষকের লাঙলের ফলা, কৃষকের বীজ, কচকচ করা কাঁচি, সাবান-বিছানা-চামচ-চেয়ার, কাঁটাতার, কপার, ক্যাকটাস, ভাঙা জিনিস, রুটি, মাটি, আগুন, বাসন, বচন প্রভৃতি। তাঁর ভীষণ প্রিয় মানুষদের নিয়েও নেরুদা ওড লিখেছেন, যেমন তিনি লিখেছেন লোরকা ও লেনিনকে নিয়ে। তুলনামূলকভাবে সিরিয়াস ও পরিচিত বিষয় নিয়েও ওড লিখেছেন নেরুদা। সেসব বিষয়ের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বৃষ্টি, বই, এমনকি সমালোচনাও। কিন্তু সেই সব বিষয় নিয়ে লিখতে গিয়েও নেরুদা তুচ্ছকে সামনে আনতে ভোলেননি।

নিচে নেরুদার দুটি ওডের অনুবাদ।

১).

সমালোচনাগাথা

পাঁচটা কবিতা লিখেছিলাম:

একটা ছিল সবুজ

আরেকটা ছিল গোলগাল গমের রুটির টুকরা

তৃতীয়টা ছিল একটা বাড়ি, একটা ইমারত

চার নম্বরটা ছিল একটা আংটি

আর পঞ্চমটা ছিল বিদ্যুতের ঝলকানির মতো অল্প মুহূর্তের

এবং যেহেতু কবিতা লিখেছিলাম

সে নিজেই আমার কারণকে ছাপ দিয়ে আমার কথা জানান দিল।

তো, পুরুষ

আর নারী

এল আর গেল

আর সঙ্গে নিয়ে চলল

আমার সহজ সরল সঞ্চয়—

হালকা বাতাস, ঢেউ-খেলানো বাতাস,

বর্ণচ্ছটা, কাদা, কাঠ

আর এই সব সাধারণ জিনিসপত্র দিয়েই

বানাল দেয়াল, মেঝে আর স্বপ্ন।

আমার কবিতার একটি পংক্তির ওপর

তারা ঝুলিয়ে রাখল সূর্যের আলোতে ভেজা কাপড়।

আমার শব্দগুলো হয়ে উঠল তাদের রাতের খাবার।

আমার শব্দগুলোকে রেখে দিল

তাদের মাথার বালিশের পাশে।

কবিতার সঙ্গে শুরু হলো তাদের বসবাস,

শুরু হলো বসবাস সেই আলোর সঙ্গে

যে আলো আমার পাশ থেকে পালিয়ে গিয়েছিল।

তখন এল এক নিঃশব্দ সমালোচক।

তারপর এল বাচালের পাল

এবং এল আরও অনেকেই—

কেউ কানা, কেউ নাকি সব দেখে, সর্বদ্রষ্টা,

তাদের মধ্যে কেউ কেউ দারুণ মার্জিত পরিচ্ছন্ন রুচিমান

কেউ কেউ এমনকি লাল জুতার বর্ণচ্ছটার মতো উজ্জ্বল

কেউ কেউ লাশের মতো কাপড়চোপড়ে ভীষণ পরিপূর্ণ।

কেউ কেউ আবার উন্নীত রাজতন্ত্রের

দলবাজি করে,

কেউ কেউ মার্ক্স মহাশয়ের ঘন দীর্ঘ ভুরুতে আটকে গিয়ে আর ঝুলে থেকে

তার দাড়িতে ঠ্যাং দিয়ে লাথি মেরে যাচ্ছিল।

কেউ কেউ ইংরেজ

পুরাদস্তুর ইংরেজ

এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ

দাঁত আর ছুরি নিয়ে

ঢাউস অভিধান আর গুপ্ত অস্ত্র নিয়ে

মাননীয় উদ্ধৃতিসমূহের কুচকাওয়াজ নিয়ে

কবিতা পড়ার যাত্রা শুরু করল।

তারা কবিতা পড়ার যাত্রা শুরু করল,

যে মানুষগুলো আমার কবিতা ভালবাসতো

সেই সহজ-সরল সুন্দর সাধারণ মানুষের কাছ থেকে

আমার কবিতাকে ছিনতাই করার জন্য।

তারা কবিতাকে ফাঁদে ফেলে মশকরায় মেতে থাকল।

তারা কবিতাকে ঠোঙা বানাল,

তারা কবিতার ভিতরে কয়েক শ পিন ঢুকিয়ে তাকে

নিরাপদে রাখতে চাইল তাদের জন্য।

কবিতাকে ঢেকে রাখল কঙ্কালের ঝুরঝুরি দিয়ে

অথবা কবিতাকে কালির মধ্যে চুবাতে থাকল,

বিড়ালের বদান্যতার নামে কবিতার ওপর থুতুও ছিটাল।

কবিতাকে ব্যবহার করল ঘড়ি মোড়াবার কাপড় হিসেবে।

মনে করলো তারা কবিতাকে রক্ষা করে যাচ্ছে এভাবে।

কাঁচা তেলের সঙ্গে কবিতাকেও তারা মজুত করল

আর কবিতাকে উৎসর্গ করে চলল

তাদের স্যাঁতসেঁতে রচনাবলি কিংবা অভিসন্দর্ভ।

তারা মাঝেমাঝে দুধ দিয়ে কবিতা সিদ্ধ করল,

নুড়ি দিয়ে কবিতাকে গোসল করাল।

আর এই প্রক্রিয়ায় কবিতা থেকে মুছে ফেলল

তার জ্বলজ্বলে স্বরবর্ণ, তার শব্দের টুকরো, তার দীর্ঘশ্বাস।

কবিতাকে তারা প্রায় খুন করে বসল।

তারা কবিতাকে দুমড়িয়ে-মুচড়িয়ে হাত-পা বেঁধে রেখে দিল

এক প্যাকেটে।

তারপর কবিতায় থাকা চিলেকোঠা আর গোরস্থানকে

সম্বোধন করল।

তারপর

একের পর এক তারা অবসর নিল—

পাগলের মতো খেপে উঠল আমার ওপর

কারণ আমি তাদের জন্য যথেষ্ট ‘জনপ্রিয়’ নই।

অথবা আমার কবিতায় নিয়মমাফিক ভুতুড়েপনার অভাবের প্রতি

খানিকটা ঘৃণায় কাতর হয়ে

তারা বিদায় নিল।

সকলেই।

এবং তারপর

আরও একবার

নারী আর পুরুষ

এল

আমার কবিতার সঙ্গে

থাকবে বলে।

আরও একবার

তারা জ্বালাল আগুন

গড়ে তুলল ঘরবাড়ি

বানাল রুটি

ভাগাভাগি করে নিল

আলো সূর্য মাটি কাদা কাঠ

এবং ভালোবাসায়

বিদ্যুতের ঝলকানির সঙ্গে

আংটির সঙ্গে

যোগ দিল।

এবং এখন:

ভদ্রমহোদয়গণ!

গোস্তাকি মাফ করবেন

এই গল্প থামানোর জন্য।

কেননা আমি নিজেই চলে যাচ্ছি চিরতরে—

ওই সহজ সরল সুন্দর সাধারণ মানুষের

সঙ্গে চিরকাল থাকার জন্যই।

২).

বইবন্দনা

বই

সুন্দর পেলব

বই

ছোট্ট বন

পাতার

পর পাতা

তোমার কাগজ

মাটি আর বায়ু আর জল আর অগ্নির

গন্ধে মৌ মৌ

বই, তুমি প্রত্যহের

তুমি রাত্রির

তুমি শস্যদানা

তুমি মহাসমুদ্র—

তোমার প্রাচীন পৃষ্ঠায়-পৃষ্ঠায়

থাকে ভালুক শিকারি

উৎসবের নীল দীপাবলি

মিসিসিপি অভিমুখে

দ্বীপগুলোতে

ক্যানু—

পরে আসে রাস্তা

রাস্তার পর রাস্তা

আলোকায়ন—

চিন্তার উন্মীলন

বিদ্রোহে টগবগ করা

শহর সব

ফরাসি কবি র‌্যাঁবো

যেন আহত

যেন রক্তভেজা মাছ

কাদায় পরে হাঁসফাঁস করছে

এবং ভ্রাতৃত্বের সৌন্দর্য

মানুষের প্রাসাদ তোলে

পাথরের ওপর পাথর দিয়ে

জড়িয়ে থাকা কষ্টদুঃখ

অটুট হয়ে—

সংহতি—

চোরা গোপন বই

পকেট থেকে পকেটে

তার যাত্রা জারি রাখে

যেন এক গুপ্ত বাতি

যেন একটা লাল জ্বলজ্বলে তারা।

আমরা

অর্থাৎ ভবঘুরে কবিরা

পৃথিবী চষে বেড়িয়েছি, খুঁজেছি তাকে

জীবন আমাদের স্বাগত জানিয়েছে

প্রতিটি দরজায় দরজায়

মাটি-কাদা-জলের সংগ্রামে

যোগ দিয়েছি আমরা।

কিন্তু কী ছিল আমাদের বিজয়?

একটা বই—

একটা বই

মানুষের স্পর্শে আর যোগাযোগে ঠাসা—

নির্জনতাহীন পিরহানে পিরহানে ঠাসা বই

মানুষ আর তার হাতিয়ারে ভরপুর বই—

বই-ই

আমাদের বিজয়।

বই পরিপক্ব হয়

বই পাকা ফলের মতো পড়ে

আছে তার আলো

আছে তার ছায়া

কিন্তু তার পৃষ্ঠাগুলোও তো ছিঁড়ে ফেলা যায়

অথবা রাস্তায় হারিয়ে যায়

মাটিতে সমাধিস্থ হয়।

কবিতার বই

ভোরের আলোর মতো ফোটে

ফিরে আসে তোমার পৃষ্ঠায়

বরফ কিংবা শেওলা ধারণ করার জন্য

যাতে তোমার পায়ের আওয়াজ

কিংবা তোমার চোখ

তাদের চিহ্ন রেখে যেতে পারে—

আরও একবার

আমাদের জন্য

পৃথিবীটাকে বর্ণনা করো

সতেজ পরিষ্কার জলের পৃথিবী

ঝরনার পৃথিবী

লম্বা লম্বা গাছের ঝাড়

বিপরীতমুখী গ্রহ

আর মানুষের বান

নতুন রাস্তায়।

এগোচ্ছে তারা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে

জলের ওপর এগোচ্ছে তারা

সমুদ্রের নগ্ন নির্জনতায়

মানুষ—মানুষ—মানুষেরা

আবিষ্কার করছে

পরম রহস্য:

মানুষেরা ফিরছে

প্রত্যেকের হাতে হাতে বই

বই

বই

বই

বই

ফিরছে শিকারি বাড়িতে—

তারও হাতে বই।

আর চাষা করছে চাষ

তার লাঙল দিয়ে

যার নাম বই।

তাঁর আরও দু’টি কবিতা –

———————————–

“বিশটি প্রেমের কবিতা এবং একটি মরিয়া গান”, (১৯২৪ সালে প্রকাশিত),

আমরা সবই বলছি … থেকে

১).

” আপনি শুনতে এসে আমার কথা,দেখেন

আমার কথা

তারা মাঝে মাঝে পাতলা হয়ে যায়

সমুদ্র সৈকতে সিগলগুলির পায়ের ছাপগুলির মতো।

নেকলেস, মাতাল রটলসনেকে

আঙুরের মতো নরম তোমার হাতের জন্য।

এবং আমি আমার কথাগুলি দূর থেকে দেখি।

আমার চেয়েও বেশি তারা আপনার।

তারা আইভির মতো আমার পুরানো ব্যথায় চড়ে।

তারা এইভাবে স্যাঁতসেঁতে দেয়ালে আরোহণ করে।

এই রক্তাক্ত গেমটির জন্য আপনিই দোষী।

তারা আমার অন্ধকার লায়ার থেকে পালাচ্ছে।

আপনি সব পূরণ করুন, আপনি সবকিছু পূরণ করুন।

আপনার আগে তারা যে একাকীত্বকে দখল করে রেখেছে,

তারা আপনার চেয়ে আমার দুঃখের প্রতিবেশী অভ্যস্ত।

এখন আমি তাদের বলতে চাই যা আমি আপনাকে বলতে চাই

যাতে আপনি আমার কথা শুনতে চান তেমনই আপনি তাদের শুনতে পান।

ইচ্ছের বাতাস এখনও তাদের টেনে নিয়ে যায়।

স্বপ্নের হারিকেনগুলি এখনও মাঝে মধ্যে এগুলিকে নক করে।

আপনি আমার কণ্ঠে অন্য কণ্ঠস্বর শুনতে পান hear

পুরানো মুখের অশ্রু, পুরনো বিনতির রক্ত।

আমাকে ভালোবাসো, সঙ্গী। আমাকে ছেড়ে যাবেন না। আমাকে অনুসরণ কর

আমাকে অনুসরণ করুন, অংশীদার, যে যন্ত্রণার তরঙ্গে।

তবে আমার কথাগুলি আপনার ভালবাসায় দাগ পড়ছে।

আপনি সবকিছু দখল, আপনি সবকিছু দখল।

আমি তাদের সব থেকে একটি অনন্ত নেকলেস তৈরি করছি

আপনার সাদা হাতের জন্য, আঙ্গুরের মতো নরম।

২).

মুঠোবন্দী মন

আরো একটি গোধূলি এসে গেল।

চরাচরজুড়ে নীল রাত নামছে,

অথচ সন্ধ্যায় আমাদের হাত-ধরাধরি হাঁটাই হলো না।

আমি জানালা দিয়ে দেখলাম

অনেক দূরের পাহাড়চূড়ায়

সূর্যাস্তের উৎসব বসেছে।

কখনো কখনো আমার হাতের তালুতে

মুদ্রার মতো

একটুকরো সূর্য পুড়তে থাকে।

মনটা বিষণ্ণ –

তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল

যে মনের কথা তুমি ছাড়া বেশি কে জানে!

তুমি কোথায় ছিলে তখন?

সাথে আর কে ছিল?

কী কথা তাহার সাথে?

যখন মনটা খুব খুব খারাপ থাকে

টের পাই, তুমি অ-নে-ক-দূ-রে,

বলো তো তখন হঠাৎ সব ভালোবাসা আমাকে পেয়ে বসে কেন?

গোধূলি এলে আমার পড়ার বন্ধ বইটা হাত থেকে পিছলে পড়ে,

চোট পাওয়া কুকুরের মতো আমার নীল সোয়েটারটি

আমারই পায়ের কাছে গড়াগড়ি যায়।

প্রতিটি দিন সন্ধ্যা এলে

তুমি সন্ধ্যাকে পেছনে ফেলে

স্মৃতির মূর্তি মুছে ক্রমশ এগোতে থাকো গোধূলি-দিকে।

————————————————

[ সংগৃহীত ও সম্পাদিত-

ঋণস্বীকার – অন্যআলো ডট কম। ]

#storyandarticle


Post a Comment