যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

পুলক মন্ডল

 

web to story

ভালো তো বাসিলাম! কিন্তু তাহার পরে?

পুলক মন্ডল


ভালোবাসার দেবতা রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “আমরা যাহাকে ভালবাসি, কেবল তাহারই মধ্যে আমরা অনন্তের পরিচয় পাই। এমনকী, জীবের মধ্যে অনন্তকে অনুভব করার অন্য নামই ভালবাসা।”

এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে ভালোবাসার রকমফের নিয়ে কিম্বা রবিবাবু যে ‘জীবে’র মধ্যে অনন্তকে অনুভব করার কথা বলেছেন সেই জীব কি শুধুমাত্র বিপরীত লিঙ্গের? এতসব জটিল দ্বন্দ্বের ভেতর না গিয়ে আমরা যদি সাধারণ কিছু কথাবার্তা বলি তা এমনতরো হতেই পারে –

ভালোবাসা এমন এক মাধ্যম, যাতে জীবনের গতিপথ হারানোর ভয় থাকে না। আমরা কেবল ভালোবাসতেই থাকি…বুঝে-না বুঝে। এক সময় সে ভালোবাসায় যুক্ত হতেই পারে প্রেম। রবীন্দ্রনাথের কথায়, ‘আমি তোমাকে অসংখ্যভাবে ভালোবেসেছি, অসংখ্যবার ভালোবেসেছি, এক জীবনের পর অন্য জীবনেও ভালোবেসেছি, বছরের পর বছর, সর্বদা, সবসময়…!’

ভালোবেসে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় হয়ে গেলেন প্রেমিকার রাতের প্রহরী- ‘তুমি যেখানেই যাও

আমি সঙ্গে আছি/ জ্যোৎস্না রাতে নক্ষত্রেরা স্থান বদলায়/ তুমি সাহসিনী,তুমি সব জানলা খুলে রাখো/ মধ্যরাত্রে দর্পণের সামনে তুমি এক হাতে চিরুনী/ রাত্রিবাস পরা এক স্থির চিত্র/ ভিখারী বা চোর কিংবা প্রেত নয়/ সারা রাত আমি থাকি তোমার প্রহরী’।

এমনতরো ভালোবাসা অনেকক্ষেত্রেই একতরফা হতে পারে। যেমন- ‘আমার দিক থেকে তো ১০০ শতাংশ। ওঁর তো শূন্য!’

এই ‘ভার্চুয়াল’ ভালবাসায় প্রাপ্তি কী? মানুষের প্রতি ভার্চুয়াল ভালবাসায় কামগন্ধ নাহি তায়, বলা যাবে না ঠিকই, কিন্তু প্রাপ্তিই বা কী? ভালবাসতে পারার আনন্দ এবং অনন্ত বিরহে থাকার শান্তি। দিনকয়েক আগে আনন্দবাজার পত্রিকায় ঈশানী দত্তরায়ের একটি লেখা পড়ছিলাম, সেখানে লেখিকা ‘নীলাঙ্গুরীয়’ উপন‍্যাসের উল্লেখ করেছেন।

উপন্যাসটির নায়ক গৃহশিক্ষক শৈলেন আর নায়িকা মীরার পরস্পরের প্রতি অস্পষ্ট অনুচ্চারিত আকর্ষণই এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। চাইলেও শৈলেনের কাছে মীরা নিজেকে সহজ করে তুলে ধরতে পারে নি আভিজাত্যের গরিমায়; তার আচরণে বারংবার মনিব-ভৃত্যের সম্পর্কটাই যেন প্রকট ভাবে প্রকাশ পেয়েছে। শৈলেন সমাজের উঁচুতলার মীরার এই আকর্ষণকে পরে উল্লেখ করেছে ‘ঘৃণামিশ্রিত ভালোবাসা’ বলে।

অন্যপক্ষে শৈলেনও মনঃস্থির করে উঠতে পারে নি – পারে নি ভালোবাসার দাবী নিয়ে সাহস ভরে মীরার সামনে এসে দাঁড়াতে। ঘটনাচক্রে দুজনের ভালোবাসা যখন দুজনের কাছে সুস্পষ্ট হল, তখন বড় দেরি হয়ে গেছে। মীরার বিয়ে হয়ে গেলেও শৈলেন আর বিয়ে করে নি। বইয়ের শেষে ইঙ্গিত আছে যে, সে আর করবেও না। ভালোবাসা খাঁটি সোনা, আর সেই সুবর্ণটি দেওয়া হয়ে গিয়েছে মীরাকে। উপন‍্যাসটির লেখক বিভূতিভূষণ মুখোপাধ‍্যায় নিজে অকৃতদার ছিলেন। তরুণ বয়সে উনি একটি কম বয়সী মেয়ের গৃহশিক্ষক ছিলেন বলেও শোনা যায়। ‘নীলাঙ্গুরীয়’র ঘটনাবলী এতো মর্মস্পর্শী যে অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছিল – এর মধ্যে বিভূতিভূষণের নিজের জীবন কিছুটা লুকিয়ে আছে কিনা!

কিম্বা বুদ্ধদেব বসুর কবিতাটা দেখুন , ‘মেঘ সন্ধ্যায় জানলার কবাট বন্ধ করল দু’টি হাত, সাদা, রুলি পরা। “আবার দু-চোখ ভ’রে ঘুম জ’মে এলো,/ সকল পৃথিবী অন্ধকার;/ এই কথা না-জেনেই মৃত্যু হবে মোর/ হাতখানা কার।/ এসেছি নিজের ঘরে, বৃষ্টিও এসেছে,/ হাওয়ার চিৎকার যায় শোনা;/ যার হাত, কাল তার মুখে দেখি যদি,/ আমি চিনিবো না।/ বিছানায় শুয়ে আছি, ঘুম হারায়েছে,/ না জানি কখন কত রাত; কখনো সে হাত যদি ছুঁই, জানিবো না,/ এ-ই সেই হাত।”

এই চিরবিরহ, পেয়েও অপ্রাপ্তি বা চির অপেক্ষাও কি ভালোবাসা? না কি এটাই একমাত্র ভালোবাসা।

ঈশানী লিখেছেন-‘আমাদের ছোটবেলা, আমাদের সময়, আমাদের ইতিহাস, আমাদের পাওয়া, না-পাওয়া, জয়ে জয়ী হওয়া, পরাজয়ে পরাজিত হওয়ার বোধই কি ভালবাসা? যা রক্তাক্ত করে কিন্তু ছাড়তে শেখায় না’।

সবশেষে আবার ভালোবাসার এক এবং একমাত্র দেবতা রবীন্দ্রনাথের স্মরণ নিই। তিনি বলছেন,

‘কিছুই তো হল না।

সেই সব— সেই সব— সেই হাহাকাররব,

সেই অশ্রুবারিধারা, হৃদয়বেদনা।

কিছুতে মনের মাঝে শান্তি নাহি পাই,

কিছুই না পাইলাম যাহা কিছু চাই।

ভালো তো গো বাসিলাম, ভালোবাসা পাইলাম,

এখনো তো ভালোবাসি— তবুও কী নাই’।

বিঃদ্রঃ আজ নাকি প্রেমদিবস! ধুস! বাঙালি রোজ প্রেমে পড়ে। এমন কি ঠকবে জেনেও পড়ে। কেননা বাঙালিকে প্রেমে পড়তেই হবে। কেননা এটাই বাঙালির ভবিতব‍্য।



Post a Comment