যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

অজয়পাড়ের উপকথা - পর্ব - ১৪

 

web to story

অজয়পাড়ের উপকথা 

সুদীপ ঘোষাল 

পর্ব  - ১৪


সন্তু বলেছিল, নিশ্চয় বলবো। কথা বলব না কেন?  আমি তো একাই থাকি। বল, কি বলবে। সন্তুর মনেও একটা কোণে পাপিয়া ডাকত।সে বলেছিল আমাকে, কিন্তু বড় সংসারের দায়ীত্ব তার কাঁধে। মায়া কাটাতে হবে। বাউলের মন হয়ে যায় সন্তুর। সে ভাবে, এসব প্রেমের বিলাসিতা কি আমার সাজে? 

সন্তু ভাবে,বারবার ভাবে পাপিয়ার কথা। কিন্তু ভালবাসা সহজে কেউ পায় না আর কেউ কেউ বাউল সাধক। মানুষের মাঝেই তাঁর বাসা। উদাস ভালবাসা। বৃন্দাবনের শান্তি বারিতেই যেন বিশ্বের মানুষ ভালোভাবে বেঁচে আছেন। সমস্ত দুঃখ তাপ জন্ম থেকে মুছে গেল মুহূর্তে।রমা বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখল আমি জোড়হাতে বিছানায় বসে আছি।

রমা জিজ্ঞেস করল কি হল তোমার তুমি কি রাধার রাগে মগ্ন আমি বললাম,হ্যাঁ আমি আমি রাধা ভাবে আচ্ছন্ন। এখন রাধার প্রেমে আমি মাতোয়ারা।জানো শ্রীকৃষ্ণ রাধা কৃষ্ণের দর্শন আমার এই ঘরে বসেই হয়ে গেল।আমি মগ্ন হয়ে থাকলাম কিছুক্ষন শ্রীরাধা ভাবে মানবদেহের রাধাভাব এর মধ্যে দেখতে পেল লেখাকে। লেখার সুন্দর মুখখানি ভেসে উঠেছে। সেই সেই মুখে কোনো ব্যথা নেই যন্ত্রণা নেই শুধু আলো আর আলো।

আমরা কয়েকদিন এসেছি। কিন্তু এই কদিন এসে আমাদের শারীরিক মিলন কিন্তু একবারও হয়নি।কেমন যেন আচ্ছন্ন হয়েছি আমি। রমা খুব অবাক হল কি হল। সে ভাবল, আমার স্বামীর এ কি হল। সে ভাবল  যে শ্রী কৃষ্ণ ভক্তিতে সে হয়তো এগুলো করতে চাইছে না। এখন বাড়ি গেলে হয়ত সব ঠিক হয়ে যাবে।পরের দিন আবার শুরু হলো বৃন্দাবনের দর্শনীয় স্থান গুলো দেখার জন্য।লেখা সুন্দরী এসে গেছেন অমোঘ আকর্ষণে।অনুপ মনে মনে ভাবল এই কথা। হয়ত আমাদের ভালবাসা হয়ে গেছে প্রথম দর্শনে।

 লেখা বলল-এখানে দর্শনীয় স্থানের অভাব নেই যুগল ঘাঁটি সেবাকুঞ্জ ও কালিয়া ঘাটাল শ্রী কুঞ্জ গোবিন্দ কুণ্ডু শিলঘাটা মদনমোহন বাঁকে বিহারী রাধাবল্লব যুগলকিশোর রাজি দামোদর গোবিন্দ গোবিন্দ।এগুলো আমাদের দেখাও লেখা। আমি বললাম, আমরা একে একে সব দর্শনীয় স্থান ঘুরবো তবে প্রথমে বৃন্দাবন মন্দির টা একবার দেখাও।লেখা বলল চলুন আজ আমরা বিদ্যামন্দিরে যাই। 

সেখানে এক বিরাট আকর্ষণ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।লেখা বলল মদনমোহন মন্দির টি কালীঘাটে র কাছে মথুরা থেকে 15 কিলোমিটার দূরে এই মন্দির গুলো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে আছে।রমা জিজ্ঞাসা করল আচ্ছা মুলতানি কাপুর কি এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন? লেখা বলল,  এটিই বৃন্দাবনের সবচেয়ে পুরনো মন্দির। বাঁকে বিহারী মন্দির, জয়পুর মন্দির রাধাবল্লব মন্দির মন্দিরটি তৈরি হয়েছিল 1876 সালে।অন্যতম আকর্ষণ রাধাকৃষ্ণের বহু মূল্যবান অলঙ্কারসমূহ। 

এগুলো ভারতবর্ষের সম্পদ।আমি বললাম আপনি এত কিছু জানলেন কি করে? লেখা বলল আমার এখানে প্রায় দশ বছর থাকা হয়ে গেল।আর বৃন্দাবন ভ্রমণ বৃত্তান্ত, বইয়ে পাবেন এসব কথা। এখানে বই কিনতেও পারেন।তাছাড়া বাইরের অনেক বই আছে। জানার ইচ্ছেটাই আসল। রমা ঘুরতে ঘুরতে লেখা আর আমার দৃষ্টির বাইরে চলে গেল।সে হয়তো অন্য  কোথাও ঘুরতে গেছে।চলে আসবে চিন্তা করবেন না। এখানে চলে আসবে। আর না হলে আমার তো সব জানা জায়গা।  

আমি খুঁজে নিয়ে আসবো ।আমি বললাম এখন ওকে দরকার নেই।এখন আমার তোমাকে দরকার।তাই আমরা হয়ত সুযোগ পেলাম বিধির বিধানে। তোমাকে একটা গোপন কথা বলতে চাই।লেখা বলল, বলুন আমিও বলবো একটা কথা কিন্তু আমি কি করলাম আর কি, লেখাকে জড়িয়ে ধরে দীর্ঘ চুম্বনের রত হলাম।এটাই চাইছিল লেখা। তার শরীর কেঁপে উঠল।  মনে মনে তৃপ্ত হল। এর মধ্যে রমা চলে এসেছে।তখন রমা দেখল আমি আর লেখা গল্প করতেই ব্যস্ত।আমি বললাম আমরা সারা জীবন যদি এখানে থাকতে পারতাম তাহলে খুব ভালো হতো।  

রমা বললো তাহলে ঘর-সংসার ছেলে চলো দুজনেই আমরা এখানে সন্ন্যাসী হয়ে থেকে যাই।তারপর,আহা তারপর দুজনে মিলে এখানে সারা জীবন কাটিয়ে দিই।লেখা বলল, তাহলে আজ এই অবধি থাক। এখন রাত্রি নটা বেজে গেছে এখন আপনারা বাড়ি যান। এই বলে লেখা নিজের গন্তব্যের দিকে রওনা দিল।লজে এসে রহমান নিরামিষ খাওয়া দাওয়া দিয়ে গেল। আহার করে তারা বিছানায় শুয়ে পড়ল। তারপর রমার সঙ্গে সঙ্গমে রত হলাম। আজ এত ভালো লাগছে কেন রমা বুঝতে পারলো না। রমাকে আসলে লেখা ভেবে অনুপ আদর করতে শুরু করলাম। 

তার মধ্যে লেখার ভাব পরিস্ফুট হতে দেখল। লেখাকে আমি আদরে আদরে পাগল করে তুললাম।রমা বলল আমি কোনোদিন এতক্ষণ এত আনন্দ পাইনি।তুমি আজকে আমাকে খুব আনন্দ দিলে।আমি বললাম, রমা তুমি কি শুনতে পাচ্ছ চারিদিকে বাঁশির আওয়াজ।কি মিষ্টি শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির আওয়াজ ভেসে আসছে।তুমি কি শুনতে পাচ্ছ বাঁশির আওয়াজ।এই বাঁশির আওয়াজ আমি শুনে এত আনন্দ  হচ্ছে কেন।রমা বলল,কই আমি তো বাঁশির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি না পাচ্ছি না। তুমি কি পাগল হয়ে গেলে।

আমি বললাম, আমি বোধহয় ভুল শুনছি নাকি। ঠিক শুনছি। এই তুমি কি পেতে শোনো দেখো বাঁশির আওয়াজ ভেসে আসছে চারিদিক থেকে।এমন সময় রমার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো। এতদিন লেখার সঙ্গে যোগাযোগ রমার সঙ্গে কথাবার্তা সব মোবাইল ফোনেই হয়েছে। লেখার মোবাইল ফোন আছে।  ফোনে রমাকে জিজ্ঞেস করল,  আপনি কি বাঁশির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছেন?চারিদিক থেকে বাঁশির আওয়াজ ভেসে ভেসে অন্তর ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে প্রেম সুন্দরের কাছে।  

 সুন্দর বাঁশির আওয়াজ ভেসে আসছে আসছে রমাদি। রমাদি আপনি শুনছেন। সন্তু দা কি শুনতে পেয়েছেন বাঁশির ইশারা।  রমা নিরুত্তর হয়ে বসে রইল।হারিয়ে যাওয়ার ভয় চেপে ধরল রমার অন্তর। সে বলল,না আর নয়, এবার ফিরতে হবে।আমি বললাম,ফিরতে পারব কি? ফেরা যে কঠিন হল মরমিয়া।রমা অনুপের কথায় হেঁয়ালির সুর খোঁজে। বাঁশির সুর তার কানে বাজে নি। সে জানে না, এখনও এখানে বাঁশি বাজে। সারা পৃথিবী জুড়ে বাঁশির খেলা চলেছে নিশিদিন। মোবাইলের ও প্রান্ত থেকে শোনা গেল লেখার গলায় বাঁশির করুণ সুর, রমার মোবাইলে সাউন্ড হাই থাকায়।  হ্যালো হ্যালো হ্যালো, আমি শুনছি বাঁশির সুর। 

এসুরে আমি মাতোয়ারা। এ সুর ভালবাসার...। তারপর বাড়ি চলে গেলাম কিন্তু মন পড়ে রইল বৃন্দাবনের লেখার খাতায়। আবার বাড়ি ছাড়লাম। লেখা শিখিয়ে দিল দেহ ছাড়া প্রেম। সে বৃন্দাবনের আশ্রম ছেড়েএল না আমার সঙ্গে। আমার আর খেদ নেইন।দেখেছি পরম পুরুষের ঈশারা। আমি গ্রামে যাব। চাষ করব। আর কোন তরুণ যেন গ্রাম ছেড়ে বাইরে না যায়। আমি তোমাদের সাহায্য চাই।রাজু বলল,আমরাও চাষ করব। আর কোথাও  যাব না। আমরাও অন্য তরুণদের উদ্বুদ্ধ  করব। 

এখন থেকে এটাই হবে আমাদের মন্ত্র। আজ সকালে উঠে থানার আই সির পারমিশন নিয়ে তারা ট্রেনে চেপে বসলনএক মাস পরে। আর কোন বাধা নেই। নতুন পৃথিবী গড়বে এবার নব উদ্যমে। সব জীবন কিন্তু সোজা সরল পথে চলে না। রাজু লাবণী আবার আর এক জোড়া জীবন ,রাজু শ্যামলী, ভবঘুরে সন্তু সবাই কিন্তু সোজা পথ পায় নি। কারও বৌ আরেকজনকে ভালবেসে পালিয়ে সুখ খোঁজে আ বার কেউবা অন্যের স্বামীর প্রতি প্রেমে পাগল হয়ে ঘরবাড়ি ছাড়ে। আমি জানি, বিশু,রমেন,বিরাজুল  ও আরও নানা সহজীবন। আমাকে সব জীবনই কিছু শিক্ষা দিয়েছে। 

কারও কাছে অগাধ ভালবাসা পেয়েছি, কেউ বা ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। কত শত্রু, কত মিত্র জীবনের শেষ বেলায় এসে' মহামানবের সাগরতীরে' মিলিত হয়,তার হিসেব রাখা দায়। হিমযুগ বা মৃত্যুপুরির নাম শুনেছি এতদিন কিন্তু আমি যে মৃত্যুপুরীতে যেতে পারবো এ কথা ভাবতে পারিনি কখনো।ছোটবেলায় মা ভয় দেখাতেন  বাড়ি থেকে বেরোবি না বাইরে। বেরোলেই তোকে ধরবে আর আঘাত করে মেরে দেবে।মায়ের কথা কোনদিন মিথ্যে হয় না না তাই না? আজ দেখি বাইরে বেরোনো কত ভয়, বাইরে বেরোলেই মৃত্যুভয় । 

এক কালো থাবা নিয়ে বসে আছে বিরাট দৈত্য তার নাম, করোনা। মৃত্যুভয় আমার  শুধু নয় পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী ঘরের মধ্যে সেঁদিয়ে গেছে কোন এক ভয়ে। এক দৈত্যের ভয়ে।পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশ লকডাউন পালন করছে। লকডাউন মানে ঘরে বসে থাকা।। ঘরে বসে থাকো, বাইরে বেরোবে না বাইরে বেরোলেই মৃত্যুর করাল থাবা বা  মহা কাল তোমাকে গ্রাস করবে।

কিছু মানুষ সাহস দেখাচ্ছে তারা বাইরে বেরিয়ে কেউ চা খেতে যাচ্ছে কেউ আড্ডা মারতে যাচ্ছে কিন্তু তারা মূর্খ তারা ভেবেও দেখছে না তাদের জন্য তার পরিবার টাও ধ্বংস হবে।বাইরে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে তারপর রোগ নিয়ে ধুঁকছে বাড়িতে হাসপাতলে গিয়ে দেখছে করোনা। টেস্ট করলে করোনা পজেটিভ তখন বাড়ির সমস্ত সদস্যকে কোয়ারান্টিনে রাখা হচ্ছে কে যে কখন মরবে তার কোন গ্যারান্টি নেই।কেমন রূপকথার মতো শোনাচ্ছে তাইনা আমাদের পরের যুগে যে যুগ আসবে তখন কার ছেলেমেয়েরা এইরূপকথা শুনবে আর ভাববে কি সুন্দর লিখে গেছে লেখক। রূপকথা ভুলবার নয়। 

এ রূপকথা যে সত্যিই তারা বিশ্বাসই করতে চাইবে না।আমরা যেমন বলি তেপান্তরের মাঠ ছিল না তারপর রূপকথাও ছিল না। সব বানানো গল্প হয়তো সেগুলো ঠিক ছিল, হয়তো সত্যি সেগুলো, আমরা তাদের মিথ্যা বলি কিন্তু এখন যেগুলো ঘটনা ঘটছে সেগুলো তো একদম রূপকথার মতোই তাই বিশ্বাস না করে উপায় নেই।


web to story













Post a Comment