যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

এরিখ মারিয়া রেমার্ক

 

web to story


“এরিখ মারিয়া রেমার্ক – বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ যুদ্ধবিরোধী ঔপন্যাসিক “

      সুমিত রঞ্জন সাহা 

বিশ্বসাহিত্যের দরবারে এরিখ মারিয়া রেমার্ক এক অতি পরিচিত নাম হলেও বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের মধ্যে অনেকেই  অবহিত নন তার সম্পর্কে। যারা অবহিত নন তাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই কিছু কথা। 

রেমার্কের লেখার সাথে প্রথম পরিচয় – যখন আমি স্নাতকের দ্বিতীয় বর্ষে। ‘ফ্লটসাম’ উপন্যাস এর বাংলা অনুবাদ হাতে পাই। অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম উপন্যাসটি পড়ে। এরপর রেমার্কের  যে লেখাটি যখনই পেয়েছি পড়ে ফেলতে এক মুহূর্ত দেরি করিনি। নিজের অজান্তেই কখন যেন তাঁর লেখার ভক্ত হয়ে গেছি। 

রেমার্ক মূলত জার্মান ভাষার ঔপন্যাসিক হলেও   তার সৃষ্টি ছাপিয়ে গেছে দেশ ও কালের গণ্ডি। প্রায় সমস্ত বরেন্য সাহিত্য সমালোচক তাকে মেনে নিয়েছেন বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ যুদ্ধবিরোধী ঔপন্যাসিক হিসেবে।

১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের 22 শে জুন জার্মানির  ওসনাব্রাখ-এ তার জন্ম। পিতা – পিটার ফ্রানজ রেমার্ক এবং মাতা- অ্যানা মারিয়া রেমার্ক।তার প্রকৃত  নাম ছিল – এরিখ পল রেমার্ক।পরবর্তীকালে তিনি নামের মধ্যাংশ 

 পরিবর্তন করে (মায়ের স্মৃতিতে) এরিখ মারিয়া রেমার্ক নামে আত্মপ্রকাশ করেন। 

ক্যাথলিক পরিবারের সন্তান হওয়ায় তার শিক্ষা স্থানীয় ক্যাথলিক স্কুলে এবং পরবর্তীতে ‘টিচার্স সেমিনারিতে’।তার বয়স যখন মাত্র 16 বছর বেজে ওঠে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা। দেশের প্রয়োজনে  সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য হন শিক্ষা অসম্পূর্ণ রেখেই (২৬শে নভেম্বর ১৯১৬তে)।

যুদ্ধে প্রত্যক্ষ লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করতে হয়েছে তাকে। বিপক্ষের গোলার আঘাতে মারাত্মক জখম হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। যুদ্ধকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে যুদ্ধের মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব  তিনি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দ্বারা অনুভব করেছেন। আর এই অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে একের পর এক কালজয়ী যুদ্ধবিরোধী উপন্যাস বেরিয়ে  এসেছে তার কলম থেকে। 

যুদ্ধশেষে জীবিকার জন্য নানা ধরনের বৃত্তি অবলম্বন করতে হয়েছে তাকে। এই অভিজ্ঞতাগুলিও তার উপন্যাসগুলিকে সমৃদ্ধ করতে পরোক্ষে  সাহায্য করেছে। 

যতদূর জানা যায়, রেমার্কের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘Die Traumbude’ (১৯২০), যার বিষয়বস্তু ছিল ভিন্ন – শিল্পের নৈতিক অবক্ষয়। 

১৯২৯ খ্রীস্টাব্দের ২৯শে জানুয়ারী প্রকাশিত হয়  ‘All Quiet on the Western Front’ – উপন্যাসটি যা যুদ্ধবিরোধী উপন্যাস হিসেবে সাড়া ফেলে দেয় সারা বিশ্বে এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয় লেখককে।এই উপন্যাসটি বিশ্বের ২২ টি প্রধান ভাষায় অনূদিত হয় এবং  ১৮ মাসের মধ্যে ২৫ লক্ষ কপি বিক্রি হয়ে যায়। ১৯৩০ খ্রীস্টাব্দে উপন্যাসটি চলচ্চিত্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। 

১৯৩১ খ্রীস্টাব্দে প্রকাশিত হয় ‘The Road Back’ উপন্যাসটি।জার্মানির তৎকালীন যুদ্ধোন্মাদ শাসকেরা রেমার্কের যুদ্ধবিরোধী অবস্থানকে বিষ নজরে দেখেছিলেন। ১৯৩৩ খ্রীস্টাব্দে নাৎসিরা ক্ষমতায় এসে তার সমস্ত লেখাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। পুড়িয়ে দেওয়া হয় তার লেখা সমস্ত বই।রেমার্ক জার্মানি ত্যাগ করে  সুইজারল্যান্ডে আশ্রয় নেন। তাকে জার্মান নাগরিকত্ব থেকে বহিস্কার করা হয় (১৯৩৮)।এরই মধ্যে ১৯৩৭ খ্রীস্টাব্দে জার্মানির বাইরেই আত্মপ্রকাশ করে তার  ‘Three Comrades’ – উপন্যাসটি।

বিষয়ের ধারাবাহিকতার বিচারে ‘All Quiet on the Western Front’, ‘The Road Back’ এবং ‘Three Comrades’  – এই তিনটি  উপন্যাসকে ‘ ট্রিলজি ‘ বলা যায়। এই তিনটি উপন্যাসে যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও যুদ্ধশেষে গৃহে প্রত্যাবর্তনের পরবর্তী পর্যায়ে সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও তার বিভিন্ন পরিনাম কে বিভিন্ন চরিত্র ও ঘটনার মাধ্যমে তিনি জীবন্তভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। 

১৯৩৯ খ্রীস্টাব্দে  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে   সুইজারল্যান্ড থেকে আমেরিকা চলে যান রেমার্ক। ১৯৩৯খ্রীস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয় ‘Flotsam’ উপন্যাসটি।

ফ্লটসাম-এ সরাসরি যুদ্ধ নয়, যুদ্ধের ফলে দেশছাড়া আশ্রয়হীন মানুষদের এক দেশ থেকে অন্য দেশে ‘রিফিউজি ‘ হয়ে খড়কুটোর মতো ভেসে বেড়ানো, বাঁচার  জন্য তাদের আর্তি, তাদের সংগ্রাম – ধরা পড়েছে। ধরা পড়েছে যুদ্ধের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া জীবন্ত ভাবে।এর মাঝেও রেমার্ক এঁকেছেন প্রেম,  বন্ধুত্ব  ও সহায়তার হৃদয়স্পর্শী চিত্র, যুদ্ধ যাদের ধ্বংস করতে পারেনি। 

১৯৪৫ খ্রীস্টাব্দে প্রকাশিত হয় ‘Arch of Triumph’ উপন্যাসটি।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসটিও দেশ থেকে বিতাড়িত আশ্রয়হীন মানুষের মর্মস্পর্শী কাহিনী।

১৯৪৭ – এ রেমার্ক আমেরিকার নাগরিকত্ব পান।১৯৪৮ – এ তিনি সুইজারল্যান্ডে ফিরে আসেন এবং তার পরবর্তী জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি সুইজারল্যান্ডেই কাটান।

আমেরিকায় থাকাকালীন  তিনি মূলত হলিউডে এবং পরবর্তী সময়ে নিউইয়র্কে  অবস্থান করেন।হলিউডে চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়েছিলেন তিনি। তার অনেক উপন্যাসই চলচ্চিত্রের রূপ পায় যার অনেকগুলিরই চিত্রনাট্য তিনি নিজেই লিখেছিলেন।এরমধ্যে দু-একটি চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয়ও করেছিলেন।

১৯৫২ খ্রীস্টাব্দে প্রকাশিত হয় তার ‘  Spark of Life’ উপন্যাসটি যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা এক জীবন্ত চিত্র। 

১৯৫৪ খ্রীস্টাব্দে ‘A Time to Love and a Time to Die’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ইংরেজি ভাষায়। এই উপন্যাসের স্বল্প পরিসরে এক তরুণ জার্মান সৈনিকের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে স্বল্প সময়ের জন্য গৃহে প্রত্যাবর্তন, পারিবারিক পরিবেশে ও প্রেমিকার সঙ্গে কয়েক দিন অতিবাহিত করা, বিবাহ  এবং পুনরায় রণাঙ্গনে ফিরে গিয়ে মৃত্যুবরণের এক অশ্রুসজল রোমান্টিক কাহিনীর মাধ্যমে যুদ্ধ কে ধিক্কার জানিয়েছেন রেমার্ক। 

রেমার্ক প্রায় এক ডজন উপন্যাস লেখেন যার বেশির ভাগেরই বিষয়বস্তু যুদ্ধ এবং যুদ্ধ উদ্ভূত পরবর্তী পরিস্থিতি। তিনি তার বাস্তব অভিজ্ঞতা উপন্যাসে জীবন্তভাবে চিত্রিত করেছেন। যুদ্ধের ভয়াবহতা কে অত্যন্ত নিখুঁত এবং বাস্তব ভাবে উপন্যাসে উপস্থাপিত করে রেমার্ক দেখিয়েছেন যে যুদ্ধ কোনভাবেই মানুষের কল্যাণ সাধন করে না,শুধুই ডেকে আনে ধ্বংস, ক্ষয় এবং মৃত্যু। রেমার্ক তার সব রচনাতেই যুদ্ধের মানব সভ্যতা বিধ্বংসী হিংস্র রূপ কে অত্যন্ত  নগ্নভাবে তুলে ধরেছেন। আবার যুদ্ধের এই রক্তাক্ত ও বিধ্বংসী পটভূমির মাঝেও তিনি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, প্রেম- ভালোবাসার চিরন্তন আর্তিকেই ফুটিয়ে তুলেছেন। 

রেমার্কের রচনাশৈলীও অত্যন্ত প্রশংসার যোগ্য।উপন্যাসের প্রতিটি চিত্র ও চরিত্র অত্যন্ত বাস্তব। তাঁর লেখায় নেই কোথাও কোন জটিলতা, নেই কোন দুর্বোধ্যতা।কোন একঘেয়েমি নেই তাঁর লেখাতে।শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখতে তিনি যথেষ্ট-ই  সফল – যা একজন ভালো লেখকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। লেখার মাধ্যমে তিনি জয় করে নিয়েছেন পাঠকের হৃদয়। 

তার এই সাহিত্যকর্ম-ই তাকে  বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকের সম্মান প্রদান করেছে।

১৯৭০ খ্রীস্টাব্দের ২৫ শে সেপ্টেম্বর বিখ্যাত এই লেখকের মৃত্যু হয়।সুইজারল্যান্ডে সমাহিত করা হয় তাকে।

তথ্যসূত্রঃ

১.Brian Murdoch

২. Wikipedia 

৩.রেমার্কের বিভিন্ন উপন্যাস।





Post a Comment