যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

রণেশ রায়

web to story



 আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় সামাজিক অবক্ষয়

রণেশ রায় 

উপস্থাপন:

সামাজিক অবক্ষয় নতুন কিছু নয় কারণ শ্রেণী বিভক্ত সমাজে শ্রেণী শোষণের বীজ নিহিত আছে যার থেকে উদ্ভব ঘটে সামাজিক অবক্ষয়। যদি কেউ বলেন আজ সামাজিক অবক্ষয় ঘটছে আগে সেটা ছিল না তবে সেটা মেনে নেওয়া চলে না। সমাজ শ্রেণীবিভক্ত হয়ে পড়ার পর থেকে বিভিন্ন জাতিতে ধর্মে বর্ণে মানুষে মানুষে বিভাজন আসার পর থেকেই সামাজিক অবক্ষয় শুরু হয়েছে। আজ ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী আগ্রাসী একচেটিয়া পুঁজিবাদের যুগে তা তীব্রতর হয়েছে, মানব সমাজ ধ্বংসের মুখে পড়েছে বলা যায়।

এই অবক্ষয় আজ সমাজ জীবনে বিভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। অর্থনীতিক শোষণ ধর্ম জাতি বর্ণ নিয়ে মানুষে মানুষে বিভেদ প্রকৃতির ওপর এই সভ্যতার আক্রমণ সামাজিক অবক্ষয়কে বহুমাত্রিক করে তুলেছে। এটা শুধু আজ অর্থনৈতিক শোষণের বিষয় নয়, শোষণ থেকে উদ্ভুত সমাজ জীবনের সব কিছুকে, রাজনীতি সংস্কৃতি পরিবেশ, বেষ্টন করে আছে এই সামাজিক অবক্ষয়।

আজকের একচেটিয়া পুঁজিবাদের যুগে সমাজটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক, আত্মসর্বস্বতা এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। পুঁজিবাদের প্রথম পর্যায়ের প্রতিযোগিতার যুগটাও আজ নেই। সর্বক্ষেত্রে প্রাধান্যবাদ। এক জাতির ওপর আরেক জাতির প্রাধান্যবাদ ধর্ম নিয়ে প্রাধান্যবাদ আর তার মূলে থাকা অর্থনৈতিক প্রাধান্যবাদ তো আছেই। তাছাড়া আজ প্রযুক্তির ওপর দখল রেখে প্রকৃতি নিধন প্রকৃতির ওপর নির্যাতন অহেতুক প্রকৃতির ওপর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।

বিশ্বায়নের অর্থনীতি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জগতের এক বিশাল পরিবর্তন এনেছে যা সামাজিক অবক্ষয়কে শেষ সীমানায় নিয়ে গেছে বিশেষ করে এশিয়া আফ্রিকার গরীব দেশগুলোকে। আর এই অবক্ষয় ধনী সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর প্রাধান্যবাদ বজায় রাখতে সাহায্য করছে। এক ধরনের সামাজিক বিচ্ছিন্নকরণ ঘটছে যা এই দেশগুলোর অধিকার স্বাধীনতা স্পৃহার গলা টিপে ধরার চেষ্টা করছে। সামাজিক আন্দোলন, অধিকারের দাবিকে অস্বীকার করা হচ্ছে। একদিকে সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ কমছে বেকারত্ব বাড়ছে অন্যদিকে আত্মস্বার্থে জর্জরিত মানুষের ভোগ লালসা বাড়ছে। মুষ্টিমেয়র আর্থিক প্রতিপত্তি বিপুলভাবে বাড়ছে। আর্থিক বৈষম্য বাড়ছে আবার একই সংগে গরীব মানুষের ওপর উচ্চবিত্ত মানুষের আত্মস্বার্থ ভিত্তিক সংস্কৃতির ভোগলালসার প্রভাব বাড়ছে।

সমাজ বিবর্তন ও সামাজিক অবক্ষয়:

এবার আমাদের মূল বিষয়বস্তুতে আসা যাক। সামাজিক অবক্ষয় আলোচনার আগে আমরা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে অবক্ষয়টা কিভাবে একটা সমাজে ঘটে তা সংক্ষেপে আমাদের আজকের জীবনবোধ দিয়ে বলে নেবার চেষ্টা করব। ধরে নিচ্ছি শোষণভিত্তিক আগ্রাসী আজের এই ব্যবস্থাটা আমরা চাই না। যারা মনে করেন এই ব্যবস্থাটা অবশ্যম্ভাবী অনড় তাদের কাছে আমার বিশ্লেষণ গ্রহণযোগ্য হবে না সেটা আমি আগেই জানিয়ে রাখি।এই সংক্ষিপ্ত আলোচনার পর বর্তমান ভারতে অবয়ক্ষয়টা কিভাবে ঘটে চলেছে কি ভয়ঙ্কর আঁকার নিচ্ছে তা বলার চেষ্টা করব।

মনে রাখা দরকার কোন সমাজের অর্থনীতি রাজনীতি ও সংস্কৃতি নিয়ে তার যেমন উত্থান ঘটে তেমনি তার পতন ঘটে। পতন ঘটে এই তিনটি বিষয়ের ক্ষয় অবক্ষয়ের মধ্যে দিয়ে। সমাজ তার অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। অর্থনীতির বিবর্তন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিবর্তন ঘটে। এরা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। অর্থনৈতিক ধরনের পরিবর্তন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের যেমন শর্ত তৈরি করে তেমনি রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন ঘটতে থাকলে তা দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোয় প্রত্যাঘাত করে যা আবার কাঠামো পরিবর্তনের শর্ত তৈরি করে। দেখা যায় আপাত দৃষ্টিতে অর্থনীতির যে কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটে যাকে আমরা উন্নতি বলে মনে করি তার মধ্যেই সমাজের অবক্ষয়ের বীজ নিহিত থাকে।

ইতিহাস এর সাক্ষ্য দেয়। ইতিহাসে সুপ্রাচীন কাল থেকে একের পর এক অর্থনীতির জগতে মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে, অগ্রগতি হয়েছে তার সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা সাংস্কৃতিক ধারা প্রবাহিত হয়েছে, সেটাই আবার সমাজে নতুন সংকট ডেকে এনেছে যা সমাজকে সংকটের সামনে দাঁড় করিয়েছে। ব্যবস্থাটা বদলাতে বদলাতে এগিয়েছে। এইভাবেই মানব সমাজ বিভিন্ন দেশে আদিম সাম্যবাদ থেকে দাস ব্যবস্থা সামন্ত ব্যবস্থা হয়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়েছে। আবার কোন কোন দেশ পুঁজিবাদ থেকে পরীক্ষামূলক ভাবে সমাজতন্ত্রে এগিয়েছে কিন্তু সমাজের মধ্যেকার মূল দ্বন্দ্বের সমাধান করতে না পারায় তার অবক্ষয় ঘটেছে, সে সামগ্রিক বিচারে আবার পিছিয়ে গেছে যদিও তার আপাত কিছু স্ফীতি হয়েছে যাকে আমরা স্ফীতি বললেও মানুষের সামগ্রিক স্বার্থে উন্নতি বলতে পারি না।

অর্থনীতিতে উৎপাদনের উপকরণের মালিকানার ধরন উৎপাদিকা শক্তি আর উৎপাদন সম্পর্কের বিকাশের ওপর নির্ভর করে ঘটে যা আবার রাজনৈতিক ব্যবস্থা সমাজ ও দেশের সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনার শর্ত তৈরী করে।এই পরিবর্তন যেমন স্বতস্ফূর্তভাবে মানুষের জ্ঞানের বৃদ্ধি প্রযুক্তির বৃদ্ধির মাধ্যমে যেমন ঘটে তেমনি তা সচেতন মানুষের প্রয়াসে ঘটে। আর উৎপাদিকা শক্তির অবিরাম বৃদ্ধি ব্যবস্থা নিরপেক্ষ একটা বিরামহীন ঘটনা। কিন্তু উৎপাদনের মালিকনা সম্পর্ক কাঙ্খিত না হলে তাতে সমাজে সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থ তেমন সিদ্ধ হতে পারে না। সুবিধাভোগী মানুষের স্বার্থে ভোগলালসায় যুদ্ধে তা কাজে লাগে।

তলানিতে পড়ে থাকা সামান্য কিছু সাধারণ মানুষের জোটে। দেশের সম্পদের ওপর তাদের অধিকার বর্তায় না। উৎপাদিকা শক্তির বৃদ্ধির পরিবর্তনটা বিরামহীন যা কখনো থেমে থাকে না। এই পরিবর্তন যেমন বিবর্তন প্রক্রিয়ায় ঘটতে পারে তেমনি বিবর্তিত হতে হতে একটা পর্যায় আসে উৎপাদিকা শক্তি উৎপাদন সম্পর্ককে মানিয়ে নিতে পারে না বলে বৈপ্লবিক পরিবর্তনে রূপ নেয় যা উৎপাদিকা শক্তি বিকাশে পথ করে দেয়। নতুন উৎপাদন সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এই পর্যায়ে উৎপাদন সম্পর্কে যেমন একটা গুনগত পরিবর্তন আসে তেমনি রাজনৈতিক জগৎ সাংস্কৃতিক জগতে গুণগত পরিবর্তন আসে কারণ এর সঙ্গে যুক্ত থাকে ক্রমাগত নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে ঘটে চলা প্রযুক্তির পরিবর্তন ভোগের ধরনের পরিবর্তন আর তাকে কেন্দ্র করে মানুষের মননে পরিবর্তন।

অর্থনীতির পরিবর্তনকে কাঠামোগত পরিবর্তন আর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনকে উপরিকাঠামোগত পরিবর্তন বলে মনে করা হয়। এই প্রসঙ্গে আমাদের সাবধান থাকতে হয় যে কাঠামোগত পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে আমরা যেন উপরিকাঠামোর পরিবর্তন আপনা থেকে আসবে ভেবে উপরিকাঠামো পরিবর্তনের গুরুত্ব আর তাকে সঠিক খাতে বইয়ে নেওয়ার বিষয়টা অস্বীকার না করে বসি। সেটা করলে অর্থনীতিবাদের গাড্ডায় পড়তে হয়। যে সচেতন মানসিকতা কাঙ্খিত খাতে বইয়ে নিয়ে যাওয়া দরকার সেটা না করতে পারলে সমাজে এক ধরনের অবক্ষয় দেখা যায়।

সেটা বিশেষ করে সোভিয়েত রাশিয়ায় বা চিনে প্রকৃত সমাজতন্ত্র গড়ে তোলার পরীক্ষায় ব্যর্থতার ফল হিসেবে দেখা গেছে বলে আমরা দেখি। সেখানে অর্থনীতির স্ফীতি ঘটলেও সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়নি কাঙ্খিত স্তরে ফলে অবক্ষয় বন্ধ করা যায় নি। পুঁজিবাদী শক্তি তার সুযোগ নিয়েছে। আবার সেই সমাজ পুঁজিবাদের কোলে ভয়ংকর রূপ নিয়ে ঢলে পড়েছে যাকে আমরা সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ বলি। সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী বলেই আমরা এ বিষয়টা খোলাখুলি স্বীকার করি। কোন গোঁজামিল দেবার চেষ্টা করি না। প্রয়োগের মাধ্যমে মার্কসবাদের বিকাশের প্রয়োজনীয়তার কথা বলতে ভয় পাই না। আজ অনেক উদারপন্থী পুঁজিবাদীরাও পুঁজিবাদকে আজকের চেহারায় দেখতে চান না। তাঁরাও মনে করেন বিকাশকে স্বতস্ফূর্ততার হাতে ছেড়ে দিলে চলে না সচেতনতার লাগাম পরাতে হয় তাতে।

এই প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার যে আদিম সাম্যবাদ থেকে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ব্যবস্থা অতিক্রম করে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় রূপান্তরে অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনটা মালিকানা সম্পর্ক ও উৎপাদিকা শক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঘটে রাষ্ট্র ক্ষমতায় নতুন শাসকবর্গের দখল নেওয়ার আগেই। এই অর্থনৈতিক পরিবর্তন উৎপাদন প্রক্রিয়া আর লেনদেনের ধরনের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঘটতে শুরু হয়। শর্ত তৈরি হয় রাজনৈতিক আর সাংস্কৃতিক জগতে পরিবর্তনের। আজ আমাদের জীবন বোধ দিয়ে এই পরিবর্তনকে বুঝলে চলবে না। অর্থাৎ আমাদের ভালোমন্দের মাপকাঠিতে বিচার করা চলে না। এই পরিবর্তন ছিল বিবর্তন প্রক্রিয়ার অমোঘ নিয়মের ফলশ্রুতি যাতে আগে কাঠামোতে পরিবর্তন আসে যাকে আজকের অর্থে সচেতন পরিবর্তন বলা চলে না। তবে সেক্ষেত্রে সচেতনার একেবারে কোন ভূমিকা ছিল না তা নয়।

তবে পুঁজিবাদ পরবর্তী সমাজতন্ত্র রূপায়ণে অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনে আগে বলপূর্বক রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রশ্নটা আসে। পূর্ববর্তী পরিবর্তনেও বলপূর্বক রাষ্ট্র দখলের বাধ্যবাধকতা ছিল, শ্রেণী যুদ্ধ অপরিহার্য ছিল। তবে তখন অর্থনীতির পরিবর্তনে নতুন ব্যবস্থাটা অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল। তাই ক্ষমতায় এসে অর্থনীতিকে ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গড়ে তোলার প্রশ্ন এত বড় করে দেখা দেয় নি। কিছু সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে তা করা গেছে। সমাজতন্ত্র গঠনের প্রশ্নে বিষয়টা আরও কঠিন।একটা বিপ্লব ঘটলেও সমাজতন্ত্র গঠনের পর বিপ্লবের প্রয়োজনটা ফুরিয়ে যায় না বরং বেড়ে যায় যা আরও কঠিন একটা প্রক্রিয়া।

সমাজতন্ত্র গঠনের পর রাষ্ট্রের ওপর দায়িত্ব পরে অর্থনৈতিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনার আর এতদিনকার গড়ে ওঠা শোষণভিত্তিক অধ:পতিত সংস্কৃতির অবসান ঘটানোর যা ধর্মীয় বাতাবরণে ধর্ম বর্ণ জাতকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে, মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে উঠেছে, শোষণ নিপীড়ন ব্যবস্থাটাকে যা মদত করে। তাই আজকের সমাজতান্ত্রিক জীবনবোধের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সেক্ষেত্রে দেখা যায় নি।

পুঁজিবাদ সেটাকে রক্ষা করেছে আর আমরা চাই সমাজতন্ত্রে সেটার অবসান ঘটুক। এই কাজটা খুবই কঠিন যেটা না করতে পারলে পিছু হঠতে হয় সমাজতন্ত্র গঠনের কাজ সার্থকতা পায় না। এই বিষয়টা মাথায় রেখে আজের সমাজের অবক্ষয়কে বুঝতে হয় সচেতন প্রয়াসের মাধ্যমে।নিজেদের মধ্যে যে অবক্ষয়ের বীজ এই শোষণ ভিত্তিক সমাজে হাজার হাজার বছর ধরে বপিত হয়েছে তাকে সমূলে উৎখাত করার জন্য সচেতন প্রচেষ্টা চাই।এর জন্যই মাও সেতুং চিনে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন যেটাকে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় নি।

আজ রাষ্ট্র পরিচালনার ধরনেও এক অবক্ষয় দেখা যায়। প্রতিযোগিতামূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের ভোটের মাধ্যমে সরকার গঠন করে মানুষের অধিকারবোধের সন্মান জানানোর রীতি চালু হয়। কিন্তু হিটলারের অভ্যুদয় ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়। একচেটিয়া পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটে। মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও আমেরিকা ব্রিটেনের নেতৃত্বে পশ্চিমী উন্নত দেশগুলো নয়া সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিণত হয়। রাজনৈতিক দলগুলো কর্পোরেট জগতের দাস হয়ে দাঁড়ায়। গণতন্ত্রের আদর্শ অবলুপ্ত হয়। কার্যত এই গণতন্ত্র ছিল শ্রেণী গণতন্ত্র। রাজনৈতিক আচার আচরণে রাষ্ট্রের ক্রিয়া কলাপে অবক্ষয় ধরা পড়ে। এই ধরনের গণতন্ত্রের নামে এক বিকৃত শাসন ব্যবস্থা ভারত সহ প্রায় সব এশিয়া আফ্রিকান দেশগুলিতে চালু হয়।

মানবজাতি আর মানব সমাজের বিবর্তন ও উত্তরণের প্রক্রিয়া দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া যার বিবরণ দেওয়া একটা রচনায় সম্ভব নয়। আমরা সংক্ষেপে আমাদের আলোচ্য বিষয়ের প্রয়োজনে সেটা সংক্ষেপে তুলে ধরব। আমরা জানি যে মানব জীবনের আবির্ভাব লগ্নে উৎপাদনের উপকরণের ওপর ব্যক্তি মানুষের মালিকানা ছিল না। জীবন যাপন ছিল প্রকৃতির দানে খেয়ে পড়ে থাকা। ফল মূল খেয়ে মানুষ জঙ্গল গুহার আশ্রয়ে বেঁচে থাকত পশুদের মত। পশুজীবনের সঙ্গে মানুষের জীবনে ফারাক তেমন ছিল না। সেই সময়কালটা ছিল মানুষের পশুর জীবন যাকে আদিম সাম্যবাদী বর্বর জীবন বলা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই বর্বর যুগ চলেছে বলে অনুমান করা হয় যে কালটাকে মার্কসের সাহিত্যে আদিম সাম্যবাদী বর্বর যুগ বলা হয়।

কিন্তু মানুষের ছিল বুদ্ধি শক্তি আর বাক ক্ষমতা ও মেহনত ক্ষমতা। একটা যৌথ জীবনের মাধ্যমে নিজের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বেঁচে থাকার জন্য সে নতুন নতুন উদ্ভাবনে সক্ষম হয়ে ওঠে।উন্নত হাতিয়ারের সাহায্যে শিকার করে খাদ্য আশ্রয় ও জীবন যাপনে উন্নতি ঘটাতে শুরু করে। সঞ্চয় করতে শেখে, পরস্পর দ্রব্য বিনিময় চালু হয়। বিভিন্ন মানব গোষ্ঠীর লড়াইএ বিজয়ীরা বিজিতদের অধিনস্থ করে। তাদের মেহনতে বিজয়ীদের সম্পদ সৃষ্টি হয় তা বাড়তে থাকে। আগুনের আবিষ্কার পাথরের ব্যবহার লোহার ব্যবহারের জ্ঞান অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়তে থেকে।ইতিমধ্যে যুদ্ধে বিজয়ীরা বিজিতদের দাসে পরিণত করে। বিজয়ীরা তাদের শাসনে রাখার অধিকার অর্জন করে সম্পত্তির ওপর অধিকার অর্জনের মাধ্যমে। শেষ হয় আদিম সাম্যবাদী বর্বর যুগের। দাস ব্যবস্থা কায়েম থাকে বহুদিন।

নতুন অর্থনীতির কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গে নতুন শাসন ব্যবস্থা যেমন চালু হয় তেমনি মানুষের জীবন যাপন আঁচার ব্যবহার শিক্ষা বিনোদন তথা সংস্কৃত জগতে পরিবর্তন আসে।এই নতুন ব্যবস্থা হল সামন্ত ব্যবস্থা। এইভাবে পুরোন প্রথমে বর্বর যুগ পরে দাস যুগ তার পর সামন্ত যুগের ব্যবস্থার ক্ষয় হয় তা বাতিল হয়ে দাস ব্যবস্থা সামন্ত ব্যবস্থা বানিজ্যিক ব্যবস্থা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার আবির্ভাব ঘটে পর্যায়ক্রমে। আর এই পরিবর্তনের ফলে মানবসমাজের প্রগতি ঘটতে থাকে। তবে আদিম সাম্যবাদী পরবর্তী সব ব্যবস্থাতেই মুষ্টিমেয়র হাতে সম্পত্তি মালিকানা থাকে আর তার জোরে শোষণ ও শাসন ব্যবস্থা চালু থাকে। পুরনো ব্যবস্থার ক্ষয় হতে হতে তার মৃত্যু ঘটে।

নতুন ব্যবস্থা অগ্রণী ব্যবস্থা হলেও তার মধ্যে নানা অবক্ষয়ের চিহ্ন দেখা যেতে থাকে কারণ নতুন নতুন উদ্ভাবনের ফলে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়তে থাকলেও মুষ্টিমেয় মানুষের কব্জায় সম্পত্তি থাকে তাদের লালসা মেটাবার জন্য তা ব্যবহৃত হতে থাকে, যুদ্ধ বিগ্রহ শাসন বজায় রাখায় তা ব্যবহৃত হয়। এর ফলে প্রগতি ব্যহত হয়, দেখা যায় অবক্ষয় প্রক্রিয়া।সঙ্গে সঙ্গে বিকল্প নতুন ব্যবস্থা আগমনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। 

আমরা আজকের দিনের বণ্টন বৈষম্য আর তার সঙ্গে যুক্ত জীবন যাপন প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে সমাজের অবক্ষয় প্রক্রিয়াটা ধরার চেষ্টা করব আমাদের আলোচনায়। উল্লেখ যোগ্য পুঁজিবাদের আগে দাস বা সামন্ত ব্যবস্থায় মেহনতি মানুষ তার নিজের উৎপাদন ও উৎপাদনের উপকরণের ওপর অধিকার বজায় না রাখতে পারলেও নিজের উৎপাদন থেকে সে সম্পুর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় নি কারণ তখন আজের মত বাজার ব্যবস্থা চালু হয় নি যদিও দ্রব্য বিনিময় ব্যবস্থা চাযলু হয়েছিল। একটা সামাজিক বন্ধন কাজ করত।

তারা যা উৎপাদন করত তার সামান্য হলেও নিজেদের জীবন যাপনে তাকে কাজে লাগাতে পারতো।বিষয়টা আজকের অবক্ষয় প্রক্রিয়া আলোচনায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কারন আজ পুঁজিবাদী সমাজের সর্বোচ্চ একচেটিয়া পুঁজিবাদী যুগে এই বিচ্ছিন্নতা সম্পূর্ণ হয়েছে। কার্যত বাজার ব্যবস্থা টাকায় লেনদেনের নিয়ম চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া তীব্রতা লাভ করে।আর এই বিচ্ছিন্নতা আত্মস্বার্থে জর্জরিত সমাজে অবক্ষয়ের প্রক্রিয়াটাকে এক ভয়ঙ্কর রূপ দিয়েছে। বিশ্বায়নের যুগে কর্পোরেট দুনিয়ার রাজত্বে এই বিচ্ছিন্নতা মানব জাতিকে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মানুষের সাথে মানুষের বিচ্ছিন্নতা প্রকৃতির সাথে মানুষের বিচ্ছিন্নতা কাজে ভাবনায় বিচ্ছিন্নতা, সমাজ জীবনের সামাজিক গ্রন্থিটাই আজ ছিন্ন ভিন্ন।

সমাজ জীবন বলে কিছু নেই। আত্মস্বার্থ ভোগলালসা প্রাধান্যবাদ মানব সমাজকে অন্ধকারে নিক্ষেপ করেছে। আর এই বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রভাব পড়ছে বিশেষ করে ভারতের মত পশ্চাদপদ দেশে যেখানে বর্ণ ধর্মে দেশটা বিভক্ত। আর রাষ্ট্র সেটাকেই মদত করছে কর্পোরেট স্বার্থ বজায় রাখার তাগিদে। ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে এক বিকৃত আত্মস্বার্থের যুগ শুরু হয়েছে। তার ফলে অবক্ষয় হয়ে চলেছে আমাদের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক আর সাংস্কৃতিক জগতে।

আপাতদৃষ্টিতে আধুনিক প্রযুক্তি যে স্ফীতি ঘটাচ্ছে তার ফলে ধনীদের সম্পত্তি বেড়ে চলেছে বিপুল মাত্রায়। একটা উচ্চমধ্যবিত্ত সম্প্রদায় এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এর ফলে যে ভোগলালসার অর্থনীতি তৈরি হয়েছে তাতে আকৃষ্ট হচ্ছে নিম্ন মধ্যবিত্ত গরীব মানুষও। আমরা এই অবক্ষয় প্রক্রিয়া কিভাবে ঘটে চলেছে তা দেখব আজকের বিশ্বায়নের অর্থনীতিতে প্রযুক্তির অপব্যবহার ঘটিয়ে আর ইদানিং কভিদ রোগের আতঙ্ক তৈরি করে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নিদান জারি করে।

কর্পোরেট দুনিয়ার আজ বাজার চাই। যুদ্ধ সামগ্রীর বাজার কম্পিউটার মোবাইল ইলেকট্রিক পণ্য ভোগলালসা চরিতার্থ করার জন্য গাড়ি দামী ফ্ল্যাট অস্বাস্থ্যকর মুখরোচক রেডি মেড খাদ্যদ্রব্য রোগীকে সারানো নয় কোন ভাবে টিকিয়ে রাখার জন্য দামী ওষুধ প্রকৃত শিক্ষা নয় বাজারি শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য শিক্ষাপণ্য নেশা দ্রব্যের জন্য বাজার। এর জন্য উগ্র বাজারমুখী মননকে এমনভাবে গড়ে তোলা যা ভোক্তার বিকৃত রুচির ভোগের অবক্ষয়ের বার্তা বহন করে। তৈরি হয় পণ্য বিক্রির জন্য সুপার মার্কেট।

কার্যত ভোক্তার বাজারমুখী উগ্র মানসিকতা বাজার অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর সঙ্গে আছে বিকৃত বিজ্ঞাপনের জন্য অফুরন্ত খরচ। মজুরি বাড়ালে শিল্প জগতের মুনাফায় টান পড়ে কিন্তু অনুৎপাদনশীল বিজ্ঞাপন খরচে কোম্পানির বাজার বাড়ে কারণ তা ক্রেতার রুচিতে মননে বিকৃতি ঘটায়, বাজার সৃষ্টি করে। কোনটা ভোগ করা দরকার কোনটা নয় বা কি অনুপাতে কোন জিনিসটা মানুষের দরকার তা পণ্য ক্রয়ে ক্রেতার মননে যেন না থাকে, শুধু তার মননে থাকে কোন পণ্য কিনলে সমাজে তার মর্যাদা কোনটা তাকে তাৎক্ষণিক আনন্দ দেয় সেটা।

বাজার ব্যবস্থাটা আজ সেভাবে সাজানো হচ্ছে। ঋণের ব্যবসা থেকে শিল্প কৃষিজাত পণ্য সবকিছুতেই ডিজিটাইজেসন। আর ভারতের মত দেশগুলোতে দেশের মানুষের জীবিকার সুযোগ ধ্বংস করে কৃষি বাজার থেকে কম্পিউটার মোবাইল সব বাজারে বিদেশি কর্পোরেটকে প্রত্যক্ষ বা বেনামে অধিকার দেওয়া হচ্ছে। এ সবই হচ্ছে সমাজের সর্বক্ষেত্রে অবক্ষয় ঘটিয়ে। রাষ্ট্রের সহায়তায়। এর জন্য দরকার রাষ্ট্রকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে রাখা। ভোগলালসায় ভরপুর মানুষও এই দুর্নীতিগ্রস্থ রাষ্ট্রের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছে। আর এই অবক্ষয়ের কাজটা চলছে অবলীলায় কোন নিয়ন্ত্রন না রেখে ভোক্তার মননে বিকৃতি ঘটিয়ে। এর জন্য কৃষি বাজার শিক্ষা স্বাস্থ্য ব্যাংক ইন্সুরেন্স সব কিছুর দখল নিচ্ছে বেসরকারি একচেটিয়া শিল্প বাণিজ্য সংস্থা।

আমাদের বোঝা উচিৎ যে এই অবক্ষয়ের মূল শাসক সম্প্রদায় ও তার সৃষ্টি করা অনুগতদের জীবনযাপনের মধ্যে নিহিত থাকলেও রাষ্ট্র এর মদত করলেও এর শিকড় ছড়িয়ে যায় গরীব সাধারণ মানুষের মধ্যেও।এর অপঘাত তীব্রতর হয় তাদের মধ্যে। তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হওয়ার মানসিকতাটা দুর্বল হয়ে পড়ে। তারাও ভোগবাদের শিকার হয়। সস্তায় উপার্জন করে ভোগবাদের তাড়নায় নিজেকে ভাসিয়ে দিতে গিয়ে নানা অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়। তারাও ভোক্তা হিসেবে বাজারে যুক্ত হয় নানা অপকর্মের মাধ্যমেভ। মেহনতের প্রতি একধরনের ঔদাসীন্য দেখা যায় যা মেহনতি মানুষের লড়াই এর পক্ষে ক্ষতিকর।অনৈতিক পথে রোজগার করার প্রবণতা বাড়ে এই ধরনের অবক্ষয়ের জন্য। একটা আধটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা তুলে ধরা যেতে পারে।

যেমন মোবাইল। আমরা জানি মোবাইল বা কম্পিউটার মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করে, অনেক কাজে তার সাহায্য দরকার। কিন্তু মোবাইলের অপব্যবহার আর তাকে নিয়ে উন্মাদনা তার সব উপকার ম্লান করে দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনে দুঃস্বপ্নের ব্যাপার হতে পারে। বাজার ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আজ এর ওপর কোন নিয়ন্ত্রন না থাকায় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী মোবাইলের মাধ্যমে শিশুমণকে যৌনতায় আকৃষ্ট করতে যে সব ছবি দেখায় তা শিশুমনের পক্ষে ক্ষতিকর। এছাড়া আছে অপরাধ জগতকে তুলে ধরে শিশুমনের বিকৃতি ঘটানো। জুয়ায় ও মাদকতায় কিশোরদের আসক্ত করে তোলা।

সব কাজ ছেড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অকাজে মোবাইলে সময় নস্ট করা। মানুষকে সমাজ বিমুখ করে তোলা। এগুলোই নামিয়ে আনে সমাজে অবক্ষয়। অবক্ষয় সমাজ জীবনের সঙ্গে ব্যক্তি জীবনে ছড়িয়ে পড়ে।এর সঙ্গে চুরি ডাকাতি মাস্তানির প্রবণতা বাড়ে। এবার আমরা এই অবক্ষয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহারের বিষয়টা ও সম্প্রতি কভিডকে সামনে রেখে কিভাবে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে ডিজিটাইজেশন ঘটানো হচ্ছে কর্পোরেট স্বার্থে সেটা দেখব কারণ বিষয় দুটো কর্পোরেট স্বার্থে সামাজিক অবক্ষয় ঘটিয়ে চলেছে।আক্রান্ত হচ্ছে সব স্তরের ব্যক্তি । এতে লাভ কর্পোরেট জগতের। এই অবক্ষয়ের ফলে খুন আত্ম হত্যা রাহাজানি ধর্ষন মানুষের দৈনিক জীবনে বেড়ে চলেছে।

মানব সমাজ বিকাশে প্রযুক্তির অপব্যবহার আর সামাজিক অবক্ষয়:

আমরা বলেছি যে মানব সমাজের বিকাশ ও অগ্রগমনে প্রযুক্তি বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে তার আবির্ভাব লগ্ন থেকেই। কর্পোরেট দুনিয়া ও তাদের পদলেহনকারীরা একে আজকের যুগের এক বিস্ময় বলে প্রচার করে প্রযুক্তির উন্নতিকে একান্ত তাদের অবদান বলে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। সম্পত্তির মালিকানা এবং তার সাহায্যে প্রযুক্তির উপর দখলদারি কায়েম করে তাকে কার স্বার্থে কিভাবে ব্যবহার করা হবে তা স্থির করার অধিকার অর্জন করেছে মালিক গোষ্ঠী। পুঁজিবাদী সমাজে এর জন্য তারা রাষ্ট্রের সমর্থন পায় কারণ রাষ্ট্র তাদের স্বার্থে পরিচালিত হয়। অথচ প্রযুক্তি একটা বহমান এমন উপাদান যা মানুষের অগ্রগমনে সহায়ক।

পুঁজিবাদের আবির্ভাবের বহুকাল আগে থেকেই কার্যত মানব সমাজের আবির্ভাব লগ্ন থেকেই মানুষের শ্রম ও মননের সমন্বয়ে প্রযুক্তির উন্নতি ঘটে চলেছে অবিরাম ধারাবাহিক ভাবে। আজকের সুউন্নত প্রযুক্তি অতীতের প্রযুক্তির উন্নতির ধারাবাহিকতা। এই ধারাবাহিকতা থেকে প্রযুক্তিকে বিচ্ছিন্ন করে একে এর প্রকৃত স্রষ্টা তথা মেহনতি মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে। নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে মানবতার স্বার্থকে ক্ষুন্ন করে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে চলেছে মালিক শ্রেণী।

 ব্যাপক সাধারণ মানুষের স্বার্থে এর ব্যবহার খুবই সীমিত এবং সেটা পরোক্ষ। শুধু সেখানেই মানুষের স্বার্থ কিছুটা ছিটে ফোটা রক্ষিত হয় যেখানে তাদের স্বার্থ অর্থাৎ মুনাফার স্বার্থ রক্ষিত হয়।সাধারণ মানুষের স্বার্থটা পরোক্ষ এবং গৌণ। অথচ যদি স্বার্থ গোষ্ঠীর স্বার্থ থেকে প্রযুক্তিকে বিচ্ছিন্ন করে তাকে মানব উন্নতির কাজে ব্যবহার করা যেত তবে মানুষের যে কল্যাণ হত তা মানবতাবোধকে রক্ষা করে সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যেত। আজের এই ভয়াভয় সভ্যতার চেহারাটা দেখতে হত না।

প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে খুলে যায় ভোগ বৈচিত্রের সম্ভাবনার দুয়ার। মানব সমাজের এই অগ্রগমন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে সেই আদিম কালে পৃথিবীতে মানবজাতির আবির্ভাবের ঊষালগ্নেই। সভ্যতারও সূত্রপাত তখন থেকেইI সেই অর্থে সভ্যতা একটা বহমান ধারণা। সমাজ প্রগতিতে প্রযুক্তি বিশেষ ভূমিকা পালন করে চলেছে। পুঁজিবাদ এই বিকাশে এক বিপ্লবী ভূমিকা পালন করেছে বলে পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় সমালোচক কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলসও মনে করেন। যে দূরদৃষ্টি নিয়ে এই দুই সমাজবিদ পুঁজিবাদের আবির্ভাবলগ্নেই বিশ্বায়নের আগমন বার্তার ইঙ্গিত দিয়ে যান তা আজকের বিশ্বায়নের সর্বোচ্চস্তরের সমর্থকরাও কল্পনা করতে পারেন না ( দ্রষ্টব্য কমিউনিষ্ট ইস্তাহার )।

তবে এই দুই মনীষী পুঁজিবাদের এই প্রাচুর্যের মধ্যেই যে তার সর্বনাশ লুকিয়ে আছে তা বীক্ষণ করেন। তাদেরও প্রশ্ন থেকে যায় মানবতার স্বার্থে এই প্রক্রিয়া কতদূর কাজ করবে। এই ব্যবস্থাকে তাঁরা এক আত্মঘাতী সঙ্কটমুখী ব্যবস্থা বলে মনে করতেন কারণ উৎপাদন সম্পর্ক আর উৎপাদিকা শক্তির মধ্যে এক বিরামহীন দ্বন্দ্ব দেখা যায় যার সমাধান এই শ্রেণী বিভক্ত সমাজব্যবস্থার মধ্যে নেইI বরং প্রযুক্তির বিরামহীন উন্নয়ন এই দ্বন্দ্বকে তীব্র থেকে তীব্রতর করে কারণ চলতি উৎপাদন সম্পর্ক ক্রমবর্ধমান উৎপাদিকা শক্তিকে ধারণ করতে পারে নাI দরকার হয় বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন উৎপাদন সম্পর্ককে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে উৎসাহিত করার।

মানুষের কায়িক শ্রম এবং তার অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষা মানুষের চেতনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রযুক্তির বিকাশের পথ সুগম করেছে। প্রত্যক্ষ শ্রম ও তার সঙ্গে অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষা যাকে আমরা মৃত শ্রম বা নিহিত শ্রম (embedded labour) বলি সমবেতভাবে প্রযুক্তির বিকাশ ঘটায়। এটি একটি বহমান ধারণা। আজকে সঙ্কটকালীন একচেটিয়া পুঁজিবাদের তথা নয়াসাম্রাজ্যবাদের যুগে আন্তঃজাতীয় কর্পোরেশনের (Transnational Corporation) রাজত্বকালে ভয়ঙ্কর মাত্রায় আবির্ভূত হয়েছে চারটি বিষয়—— প্রযুক্তিবিপ্লব ও তার অপব্যবহার, সমরবাদ, ভোগবাদ আর দূষণ ও জঙ্গল সাফের দৌলতে প্রকৃতির উষ্মায়ন।

এই সমস্যাগুলোকে উদারনীতিবিদরা দুষ্টসমস্যা বললেও তারা উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় এদের অবশ্যম্ভাবী বলে মনে করেন। সমস্যাগুলো সমূলে উৎপাটন করা বা এগুলোর যাতে উদ্ভব না হয় তা না ভেবে সমস্যাগুলো এলে নেহাৎ মৌখিকভাবে তার প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। ভোগবাদ আর সমরবাদকে অস্বীকার তো করা হয়ই না বরং বাণিজ্যের স্বার্থে লোভ চরিতার্থ করার জন্য তাকে মদত করা হয়। অথচ আমরা জানি দারিদ্র, দুর্ভিক্ষ, মহামারী থেকে এ সমস্যাগুলো কোনভাবেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

আজ নয়া-উদারনীতিবিদরা শ্রম থেকে চেতনাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখাবার চেষ্টা করে। চেতনা যেন শ্রম নিরপেক্ষ অতিপ্রাকৃতিক প্রতিভা যা জন্মসূত্রেই পাওয়া যায়। শ্রমের সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই। এটাই হল জন্মলব্ধ বুদ্ধিবৃত্তি যা প্রযুক্তির জন্ম দেয়। উচ্চবিত্তরাই এর ধারক ও বাহক। শ্রমজীবী মানুষের এর ওপর দাবি থাকতে পারে না। জন্মসূত্রে পাওয়া বিশেষ প্রতিভার প্রচেষ্টায় গবেষণাগারে প্রযুক্তির জন্ম হয়।

 পুঁজি খরচ করে যে পুঁজিপতিরা এই গবেষণাগার তৈরী করে তাদেরই প্রাপ্য প্রযুক্তি এবং তার ফল। পুঁজির মালিকানার জোরে প্রযুক্তির ওপর প্রাধান্যকামী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ কায়েম হয় সেটাকে আড়াল করার চেষ্টা চলে। বলা হয় না যে তারা নিজেদের স্বার্থে প্রযুক্তির ব্যবহার করে। আর এর থেকেই উদ্ভব ঘটে ভোগবাদ আর সমরবাদ। এছাড়া এমন প্রযুক্তির আজ অবাধ ব্যবহার যা প্রকৃতির ভারসাম্য বিঘ্নিত করে, এমন পণ্য সামগ্রী উৎপাদনে সাহায্য করে যা মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষে মারাত্বক। আজ এটা প্রমাণিত সত্য। এই কারনে উন্নত `সভ্য` দেশগুলো অজস্র এমন পণ্যের উৎপাদন ও ভোগ নিজেদের দেশে নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু তাদের বহুজাতিক সংস্থাগুলোর স্বার্থে তা ভারতের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশে অবাধে উৎপাদন করে তা নিয়ে ব্যবসা করে চলেছে। গরিব দেশের মানুষেরা এর ভোক্তা। সবই চলে খরচ কমিয়ে লাভ বাড়ানো আর তার সঙ্গে বাজার দখলের তাগিদে। 

এভাবে মানুষের ক্ষতি করে প্রযুক্তির অপব্যবহারের প্রবণতাকে আমরা প্রযুক্তি সর্বস্বতা বা প্রযুক্তিবাদ বলি। সুতরাং প্রগতির স্বার্থে প্রযুক্তির আবিষ্কার প্রযুক্তির ব্যবহার আর প্রযুক্তিসর্বস্বতা তথা প্রযুক্তিবাদ এক বিষয় নয়।প্রযুক্তি সর্বস্বতা এক ধরনের সামাজিক অবক্ষয়। প্রযুক্তি সর্বস্বতা বা প্রযুক্তিবাদ প্রযুক্তির বিকাশ ও আবিষ্কারের আসল কারিগর শ্রমজীবী মানুষের অবদানকে অস্বীকার করে। 

যুক্তিবাদকে অস্বীকার করে তার জায়গায় স্থান দেয় ভাববাদকে যা অতিপ্রাকৃত সর্বশক্তিমান তথা ভগবানের অনুগ্রহের কারাগারে মানবসমাজকে বন্দি করে রাখতে সচেষ্ট হয় । আর এর জন্য দরকার হয় সমরবাদ এবং একইসঙ্গে অন্ধ ভক্তিবাদের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা মৌলবাদ ( সে ধর্মীয় মৌলবাদী-ই হোক বা অন্য কোন ধরনের মৌলবাদ-ই হোক ) —– তাদের মধ্যে এক সমঝোতা। মৌলবাদ হ`ল বিজ্ঞান বিরোধী। অথচ যুক্তিভিত্তিক প্রযুক্তির উন্নতি ছাড়া, প্রযুক্তির ওপর মুষ্টিমেয়ের দখল প্রতিষ্ঠা না করে পুঁজিবাদ টিঁকে থাকতে পারে না।

 এখানেই পুঁজিবাদ আর মৌলবাদের বিরোধ ঘটে। অথচ ব্যাপক সাধারণ মানুষকে ধ্বংস করার জন্য সমাজতন্ত্রকে উচ্ছেদ করার জন্য সাম্রাজ্যবাদকে মৌলবাদী শক্তির সঙ্গে যেমন সন্ধি করতে হয়, মৌলবাদকে মদত করতে হয় আবার প্রযুক্তির সুযোগ পাওয়ার জন্য নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের স্বার্থে মৌলবাদের বিরোধিতা করতে হয়। এক স্ববিরোধতার উদ্ভব ঘটে। এর থেকেই এক ধরণের বা আরেক ধরনের সন্ত্রাসবাদের সৃষ্টি হয় যা অবক্ষয়বাদের একটা নমুনা।

প্রাধান্যবাদী এই ব্যবস্থায় শ্রম ও যুক্তি সৃষ্ট প্রযুক্তির মালিকানার ওপর দখল পায় পুঁজিপতিগোষ্ঠী। মানুষ তার নিজের সৃষ্টির থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। স্রষ্টা হারায় সৃষ্টি তার, মালিক হয় দখলদার। ফলে উন্নত প্রযুক্তির দরুন যে শ্রম সময় বাঁচে, খরচ কমে , উৎপাদনে বৈচিত্র আসে তার সুফল শ্রমজীবী মানুষ পায় না। তাদের শ্রম সময় কমে না, প্রকৃত মজুরি বাড়ে না। বরং উন্নত প্রযুক্তিতে পুঁজি নিবিড়তা বাড়ে। শ্রমিক ছাঁটাই হয়। দীর্ঘদিন লড়াই করে শ্রম সময় কমাতে সক্ষম হয়েছিল শ্রমজীবী মানুষ।

 আজ কর্মসংকোচনের যুগে আবার শ্রমজীবী মানুষকে আট ঘন্টার বেশি কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। কোথায় প্রযুক্তির উন্নতির সুযোগ কিছুটা হলেও শ্রমজীবী মানুষ পাবে তা নয় বরং তাদের ওপর শোষণ বেড়ে চলেছে। অপরদিকে মালিকের লাভের সুযোগ বাড়ে কারন উৎপাদন প্রক্রিয়ায় উদ্বৃত্ত শ্রম সময় ও তার সাথে উদ্বৃত্ত মূল্য বাড়ে। মুষ্টিমেয়ের হাতে সম্পদের সমাবেশ ঘটে। পুঁজির সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদনের কেন্দ্রীভবন বাড়ে। একই সঙ্গে দখলদারি ব্যবস্থায় দখল বজায় রাখার জন্য সমরবাদের বিস্তার ঘটে। বাজারে উৎপাদিত পণ্যের বন্যা বয়ে যায় বলে তা বিক্রি করতে হয়। চাহিদা বাড়াবার নানা ব্যবস্থা করতে হয়। ভোগবাদের সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়। ঋণের মাধ্যমে ভোগ্য দ্রব্য ক্রয়ের সুযোগ করে দিতে হয়।

 ব্যাংকে সাধারণ মানুষের জমা টাকা থেকে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়, ক্রেডিট কার্ড ডেবিট কার্ডে কেনার সুযোগ বাড়াতে হয়। আজ ভারতে মোদী সরকারকে সেটাই করতে দেখা যাচ্ছে। এছাড়া অবাধে পরিবেশ শত্রু প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়ে চলে। বিশ্বায়নের ছাতার তলায় সব দেশকে নিয়ে এসে দক্ষিণের অনুন্নত দেশগুলোতে সেসব দেশের কাঁচামাল শ্রম জমি ব্যবহার করে সেখানকার পরিবেশ ধ্বংস করে উৎপাদন করিয়ে নেওয়া হয়। প্রাপ্য লাভ পুঞ্জীভূত হয় বহুজাতিক সংস্থার হাতে। উত্তরের উন্নত দেশের মৃগয়াক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায় দক্ষিণের দেশগুলি।এসবই হল আমরা যাকে বলি সামাজিক অবক্ষয়।

পরিবেশের প্রশ্নে আমরা দেখি আজ মূল ভারতে যে সব শহর গড়ে উঠেছে সেখানে দূষণ যে মাত্রায় গিয়ে ঠেকেছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে ভারত যে প্রাকৃতিক বিপদের মুখে পড়বে সেটা পুঁজিবাদের সমর্থকরাও স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে। তাও সমর শিল্প নোংরা শিল্প ও নির্মাণ শিল্পের আক্রমন কমছে না বরং বেড়ে চলেছে। গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করে হয়ে চলেছে এক ধূসর নগরিকরন। দেশের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর ওপর খনি লুঠের তাগিদে নজর পড়েছে বহুজাতিক সংস্থার।

 সবুজকে জঙ্গলকে সাফ করে মানুষকে জীবিকাচ্যুত করে চলছে শিল্পের নামে এক ধ্বংসলীলা। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে খনিজ সম্পদ লুঠ করে কর্পোরেট সস্থার দাবি মেটাতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বিদেশে। ভারতব্যাপি যে উন্নয়নযোগ্য চলছে তাতে উচ্চবিত্তরা আরো বড়লোক হচ্ছে আর প্রান্তিক মানুষদের আরো প্রান্তিকরণ ঘটে চলেছে। এই প্রসঙ্গে আমরা আজের ভারতের প্রান্তিক অঞ্চলের ওপর আক্রমনের নমুনাটা আমরা দেখি । কিভাবে পরিবেশের সর্বনাশের ক্রিয়াকান্ড চলছে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেটা আজ সর্বজনস্বীকৃত।

‘সামাজিক দূরত্ব’, করোনা ভাইরাস ও লক ডাউন

করোনা এক ভাইরাস যাকে COVID 19 বলা হচ্ছে তা এক মানব দেহ থেকে অপরদেহে সরাসরি সম্পর্কে খুব দ্রুত সংক্রমিত হয়। টিকাকরণের সাথে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে শারীরিক সম্পর্ক স্থগিত রেখে এই সক্রমন রোধের একমাত্র উপায় বলে মনে করা হচ্ছে। এর জন্য সবরকম যোগাযোগ বাজার স্কুল কলেজ দোকান পাট বন্ধ রেখে লক ডাউনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে যদিও এতে দেশের অর্থনীতি স্তব্ধ হয়ে যায় মানুষের রুটি রোজগার বন্ধ হয়। তাও স্বল্পকালীন ব্যবস্থা গ্রহণ করে এই সংক্রমণ রোধ করা আশু দরকার।

 চীন বা ভিয়েতনামের মত দেশ দক্ষিণ কোরিয়া উত্তর কোরিয়া ইরান এই পদ্ধতিতে সাফল্য পেয়েছে। সময়মত আমেরিকা ইতালি বা স্পেন সেটা করে নি বলে তাদের ভুগতে হচ্ছে বলে খবর। এই অবস্থায় সারা পৃথিবীশুদ্ধ ভারতেও কিছুদিন পূর্ণ মাত্রায় লক ডাউন চলেছে। এটা সমস্যা সমাধানের আশু ব্যবস্থা হতে পারে। কিন্তু আমাদের আপত্তি ‘সামাজিক দূরত্ব’ কথাটা ব্যবহারে। 

এটা কার্যত শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার ব্যাপার তবে কেন সামাজিক দূরত্ব? আমরা বরং বলি সামাজিক সংহতি বাড়িয়ে পরস্পর সহমর্মিতা বাড়িয়ে সমাজিক নৈকট্য ও বন্ধন বজায় রেখে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা থুতু ফেলার মত বদ অভ্যেস দূর করার কথা বলার দরকার। সমাজের ভালোর জন্য যা নিজেকেও ভালো রাখে তার কথা বলা। এর জন্য সামাজিক দূরত্ব কেন? সমাজ বলতে নেহাৎ কিছু মানুষের জমায়েত বোঝায় না। এটা একটা সংখ্যা নয়। এক একটা বিচ্ছিন্ন মানুষের যোগফল নয়। সমাজ একটা গুণগত ধারণা যা মানুষের সাথে মানুষের মননের কথা পরস্পর পরস্পরের সহযোগিতার কথা বলে। সেখানে সামাজিক দূরত্ব কথাটা ব্যবহৃত হল কেন? সেটা জানতে এই কথাটা আনুষ্ঠানিকভাবে যারা চালু করেছে তাদের কথাই নিচে তুলে দিচ্ছি:

“the practice of maintaining a greater than usual physical distance from other people or of avoiding direct contact with people or objects in public places during the outbreak of a contagious disease in order to minimize exposure and reduce the transmission of infection
San Francisco issued recommendations for social distancing on Friday, advising residents to stay home as much as possible and avoid congregating in large groups.”
— Taryn Luna and Melody Gutierrez (collected from Google)

পশ্চিমী জগতের সংস্কৃতি অনুসরণ করেই কথাটা এসেছে। সেখানে করোনা আসার বহু আগে পুঁজিবাদের সংস্কৃতির ধারা অনুসরণ করে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে জীবন যাপন করা হয়। খুব অল্প বয়স থেকে ছেলে মেয়েকে বাবা মায়ের থেকে আলাদা করা হয়। বাবা মার শেষ জীবনে বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয়। বাড়িতে নয় ক্লাবে সামাজিক সমাবেশ। 

মদের বোতলে আড্ডা। বর্তমানে পরিবারের কাঠামো ভেঙে ভারতের মত দেশেও এই সংস্কৃতি চালু হয়েছে। আর এই সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে আজ কিছু মানুষের অমানবিক কাজ ঘটে চলেছে। বাড়িওয়ালা ডাক্তার নার্স ভাড়াটেকে বাড়ি ছাড়া করছে। পরিযায়ী শ্রমিককে কিছু লোক গ্রামে ঢুকতে দিচ্ছে না। এর পর দেখব সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার অজুহাতে কোন আক্রান্ত বৃদ্ধ দম্পত্তিকে ঘর ছাড়া করে বাড়ি ছাড়া করে তার দখল নিচ্ছে কোন স্বার্থ গোষ্ঠী। আর আমরা পাশের বাড়িতে বারান্দা থেকে সেটা দেখছি। নেমে প্রতিবাদ করব কি করে আমাদের যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হয় !

 আমিতো আজ বিচ্ছিন্ন একা। আমার আবার সামাজিক দায়িত্ব কি? সামাজিক বন্ধন সেখানে দুর্বল। দুজনের বেশি এক গাড়িতে যাওয়া যাবে না। তাই সমন্ন পরিবারে প্রতি দুজনে একটা গাড়ির প্রয়োজন। যে বসে যেত তার সক্রমন ঘটবে তাই তার গাড়ির দরকার। এক বোনের কাপড় বা জামা আরেকজন পড়লে সংক্রমনের ভয় তাই আলাদা কাপড় দরকার। গরিব ঘরেও প্রত্যেকের আলাদা মোবাইল। একজনকে আরেকজনের ভয়। একে অপরে অবিশ্বাস। এই ফাঁকে নতুন করে বাজার গঠন চাহিদা তৈরি যাতে পুঁজিবাদ বাঁচে। এক বিচিত্র সংস্কৃতি বিচিত্র জগৎ। এই হল সামাজিক দূরত্বের মুক্ত আকাশ মুক্ত অর্থনীতি বিচ্ছেদ বিভেদের সংক্রমিত দুনিয়া।সামাজিক অবক্ষয়। এই রোগের সমাধানের জন্য সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বোধ সাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এতদিনকার সাবেকি ব্যবসা বাণিজ্য লাটে ওঠে। এই ছিদ্র ধরে অন লাইনের ব্যবসা চালু হয়।

 শিক্ষা স্বাস্থ্য ব্যাংক সর্বত্র ডিজিটাইজেসন কর্মসূচি চালু হয়। আমাজন ফ্লিপকার্ডের মত বড় বড় কর্পোরেট বিভাগ পিন থেকে হাতি সব ব্যবসায় ঢুকে পড়ে অবাধে। কৃষি বিভাগে তাদের অবাধ প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়া হয় তথাকথিত কৃষি কৃষি মাধ্যমে।। বেসরকারিকরণ এর কর্মসূচি অবাধ হয়ে যায়। এর ফলে সামাজিক অবক্ষয় বেড়ে চলে। বেকার সমস্যা বৃদ্ধির ফলে অপরাধের জগৎ টাও অবাধ হয়ে যায়।

মনে রাখা দরকার এটা নেহাৎ ভালো মন্দের ব্যাপার না। পুঁজিবাদের দর্শনে গলাকাটা প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজেকে টিকিয়ে রাখার দর্শনের প্রতিফলন ঘটে এই ‘সামাজিক দূরত্ব’ তথা সামাজিক অবক্ষয়ের সংস্কৃতিতে। দারউইনের Survival of fittest কথার অপভ্রংশ ব্যবহার করে অর্থনীতিবিদরা প্রতিযোগিতা তথা অন্যকে মেরে নিজে টিকে থাকার কথা বলেন। একটা গালভরা অভিজাত কথা যেটা আমরা বুঝে না বুঝে অহরহ ব্যবহার করি। এই সংস্কৃতিকেই বহন করে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বা social distancing কথাটা। অথচ আমরা এই ধরণের সংকটের মুখে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টা সম্পর্কে জানি।

বিষয়টা নতুন কিছু নয়। নতুন হল এমন একটি শব্দের আমদানি যেটা উচ্চারণ করে আমরা তৃপ্তি পাই, নিজেদের বুদ্ধিমান মনে করি। মনে রাখা দরকার এই প্রতিটি কথা ব্যবহার করার উদ্দেশ্য আছে। কারণ ব্যতীত এই শব্দ এত ঘটা করে চালু হয় না। অন্য অর্থে নেহাৎ প্রয়োজনে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা বহু প্রচলিত।

 তবে সেটা কোন অর্থেই সামাজিক দূরত্ব নয়। এই শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখেও সামাজিক নৈকট্য বজায় রেখে কি অপরিসীম যত্ন আমরা পরিবারের মা বোনদের থেকে পেয়েছি আজও পেয়ে থাকি সেটা আমরা জানি। তার জন্য সামাজিক দূরত্বের দরকার হয় না বরং সামাজিক বন্ধন নৈকট্যই এর শর্ত। আজ একে র থেকে অপরকে বিচ্ছিন রাখার দর্শন প্রতিফলিত হয় এই কথায় । আজ সামাজিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত রূপ হলো আত্মস্বার্থে জর্জরিত এই বিচ্ছিন্নতা যার মধ্যে আমরা বাস করছি।

আমরা আমাদের আলোচনায় আর্থসামাজিক ব্যবস্থার বিবর্তন প্রক্রিয়া ধরে তার থেকে উদ্ভুত সমাজের অবক্ষয় প্রক্রিয়াটা আলোচনা করলাম। কার্যত সভ্যতার বিকাশের ধারার মধ্যেই নিহিত আছে অবক্ষয়ের ক্ষতগুলো। প্রধান ক্ষতগুলো ধরে আমরা আলোচনা করলাম। সমাজ জীবন ব্যক্তি জীবন আজ অজস্র ক্ষত জর্জরিত।

Post a Comment