যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

মৌসুমী সরকার

web to story


 দাম্পত্যের রকম – সকম

মৌসুমী সরকার, সমাজতত্ত্বে এম. এ.

রুনুর বিয়ে হয়ে গেল সম্বন্ধ করে এক মোটা মুটি ভালো মাইনের চাকুরে ছেলের সাথে । সংসারে ঝামেলা বলতে কিছু নেই, শ্বশুর শাশুড়ি, আছেন, তাকে চা তৈরীআর পরিবেশন ছাড়া তেমন কিছু কাজ করতে হয় না, মফস্বল এ শ্বশুর বাড়ি, সেও মফসলের মেয়ে, স্বভাব টি তার ছোট থেকেই বড়ো শান্ত, বাবার শরীর বিশেষ ভালো নয়, মা খুব চিন্তা করেন, তাই সে বিয়ে তে রাজি হয়ে গেছে, বাইশে পড়েছে সে, পি এইচ ডি করার খুব ইচ্ছা বিষয় তার, ইতিহাস, একটা ব্যাপার সে কিছুতেই বুজতে পারে না, যে লোকে কেন ঝগড়া করে !

বিশেষত স্বামী স্ত্রী যারা! ঝগড়া ঝাঁটি সে একেবারে পছন্দ করে না, দুটো আলাদা পরিবারে ঝগড়া, জমি নিয়ে বিবাদ, এসব না হয় বোঝা গেল, কিন্তু একেবারে ঘরের মধ্যে ঝগড়া, তার একটুও পছন্দ হয় না, সে বিয়ের আগে বাবা মার মতান্তর ও অনেক বার থামিয়েছে, তার কথা শুনে বাবা মা, হেসে চুপ করে গেছেন,, সে শান্ত মেয়ে, সে একেবারে ঠিক করেছে কখনও বরের সাথে ঝগড়া করবে না, মতান্তর? আহা! সে তো হতেই পারে! তা বলে কি গলা উঁচিয়ে বরের সাথে কথা বলতে হবে! এই বিষয় নিয়ে সে জেঠ্যা শ্বশুর মশাই এর সাথে কথা ও বলেছে, উনি একটু চুপ করে থেকে হেসে বলেছেন ,”তুই নিজেই বুজতে পারবি, মা ।

“ উনি আসলে রুনু কে নিজের মেয়ের মতো ভালো বাসেন । রুনুর শ্বশুর বাড়ি তে জেঠ্যা শ্বশুর, ওর নিজের শ্বশুর শাশুড়ি আর বর, এই কজনে থাকে । জেঠ্যা শ্বশুর মশাই এর অনেক বিষয়ে অগাধ পান্ডিত্য, জেঠীমা মারা যাওয়ার পর বই পত্র নিয়ে থাকেন,, বই পড়া, আর ঠাকুর পুজো এই করেই ওনার সময় কাটে । দুই বেলা মন্ত্র পড়েন, রুনুর ভারী ভালো লাগে । মাঝে মাঝে বলেন, “হরি হে, সবই তোমার লীলা ““উনি কলেজ থেকে অবসর নিয়েছেন, কয়েক বছর । শ্বশুর বাড়ি তে তার সব ভালো লাগে শ্বশুর, শাশুড়ি কে,, সুন্দর দোতলা বাড়ি কে,, বিবাহিত ননদ, কে এমন কি আসল যে লোক তার বর কেও ।

যদিও বরের সাথে পরিচয় বেশি দিনের নয়, ছয় মাস হলো তার বরের সাথে একদিন ও ঝগড়া হয় নি । সে একেবারে প্রতিজ্ঞা করেছে এ ব্যাপারে! ননদ কে একথা বলতে সে কেমন অবাক হয়ে, হেসে চলে গেল, আর শ্বশুর শাশুড়ি কিন্তু বেশ ঝগড়া করে, সে থামাতে গিয়ে ও পারে না, আর এই! এই খানেই তার হয়েছে অসুবিধা !, একদিন, তার খুব ইচ্ছা বর কে নিয়ে সিনেমা দেখতে যাবে, শুনলো বরের ক্যারাম খেলা আছে জোরদার সেদিন,, এই প্রথম বরের ওপর যেন একটু রাগ হলো তার, থাক,, সে একদম ঝগড়া করবে না ঠিক করেছে! আবার একদিন।

…… বরের কয়েকজন বন্ধু এসেছে, খাবে, তাদের বাড়ি, রুনু র বাপের বাড়ির অবস্থা খারাপ নয়, ছোট থেকেই সে দেখেছে বাড়ি তে রান্নার লোক আছে, সেও পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে শিখেছে কিছু ভালো রান্না, সে যথা সম্ভব শাশুড়ি মা কে সাহায্য করেছে, আর চপ আর চাটনি নিজে বানিয়েছে । সবাই খেয়ে বেশ ভালো বললো, কিন্তু …. বর বললো চপ ভালো ভাজা হয় নি আর চাটনি তে হলুদের গন্ধ! থাক, থাক, ….. সে ঝগড়া করবে না, একদম ,, আরো একদিন ,….. কাচার লোক আসেনি, সে পড়াশোনা করে, য়ুনিভার্সিটি যায়, শাশুড়ি কে সাহায্য করে, সে জামাকাপড় সব কেচে দিয়েছে বরের, পরে শুনতে পেলো, বর বলছে সেগুলো নাকি ভালো পরিষ্কার হয়নি, ইতি মধ্যে সে আবিষ্কার করেছে, বরের যথেষ্ট জোরে নাক ডাকে, আর খাবার সময় যথেষ্ট শব্দ হয়, যেগুলো সে একেবারে অপছন্দ করে, থাক থাক থাক ,….. সে ঝগড়া করবে না!

বিয়ের আট বছর হয়ে গেছে, একটি ছোট্ট মেয়ে হয়েছে তার, চার বছরের মেয়েকে বাংলা পড়াতে গিয়ে সে শুনতে পেলো বর বলছে, সে নাকি ভুল উচ্চারণে পড়াচ্ছে, তার উচ্চারণের খুব গন্ডগোল আছে, এর মধ্যে তার পি এইচ ডি ডিগ্রী হয়ে গেছে ,….. এইবার! রুনুর মধ্যে যেন একশ বাঘ … হঠাৎ জেগে উঠেছে “কি বললে তুমি ?” আমি ভুল পড়াই? “

…… তার নিজের গলার শব্দে, সে নিজেই অবাক! এই প্রথম সে ঝগড়া করছে, বর অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে, আর কিছু বলতে পারছে না, শাশুড়ি মা পুজো থামিয়ে, আবার মুচকি হেসে, পুজো শুরু করলেন, শ্বশুর তো আগেই বলে দিয়ে ছেন, তিনি কানে কম শোনেন, আর কানে কম শোনা নাকি ভালো! রুনু বলতে শুরু করেছে, রেগে কত কথা, তার বরের এতদিন ধরে যেগুলো খারাপ লেগেছে, সেই সব দোষের কথা ,,, এতদিনে সে বুজতে পেরেছে ঝগড়া ছাড়া কোনো দাম্পত্য সম্পূর্ণ হয় না,দাম্পত্য জিনিস টাই এক আশ্চর্য সমীকরণে তৈরী, তার গলা শুনে বাড়ির ঝি বুড়িও হেসে ফেলেছে, পাশের ঘর থেকে জেঠ্যা মশাই ও শুনতে পেলেন, বোধ করি, তাই জোরে চিৎকার করে বললেন ….”. হরি হে, মধু সূদন, সবই তোমার লীলা! “



Post a Comment