যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

আশিস চৌধুরী

 

web to story


তুমি শুধু পঁচিশে বৈশাখ আর বাইশে শ্রাবণ নও-

আশিস চৌধুরী

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমাদের হুল্লোড়পনা দেখে কবি বিষ্ণু দে-র কলমে উঠে এসেছিলো এই কথা-‘তুমি শুধু পঁচিশে বৈশাখ আর বাইশে শ্রাবণ?’তাঁর এই আক্ষেপ অনেক সময় আমাদের মধ্যেও ছড়িয়ে যায় ।আমরাও তখন ভাবতে থাকি সত্যিই কি রবীন্দ্রনাথ ওই দুটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ? তিনি যে সময় এ কথা বলেছিলেন আজও হয়তো তার প্রাসঙ্গিকতা আছে,তবু বলব সামগ্রিক অর্থে রবীন্দ্রনাথ আমাদের জীবনে এমনভাবে জড়িয়ে গেছেন যে তাঁকে বাদ দিয়ে আমাদের হয়তো অনেকেরই দিন চলে না।

এমন অনেক মানুষ আছেন যাদের জীবনে এমন একটা দিন ও বোধ হয় নেই যে সেদিন তিনি রবীন্দ্রনাথের কোনও গান শোনেননি ।কারণটা কি?শঙ্খ ঘোষের মর্মস্পর্শী কলমে উঠেএসেছে সেই কথা ।’জীবনে তো আমদের সবারই এমন কোনও মুহূর্ত আসে, ভিতরে ভিতরে ধ্বনিত হতে থাকে সব মিথ্যা বৃহৎ বঞ্চনা,পৃথিবী থেকে যখন মুখ ফিরিয়ে নেয় মন,অভিমানে টলটল করতে থাকে আমাদের অস্তিত্ব।

আর সেই সময়েই মন আশ্রয় খোঁজে নিবিড় আর নির্ভর যোগ্য কোনও বন্ধুর কাছে।’ হ্যাঁ,রবীন্দ্রনাথই হচ্ছেন আমাদের সেই নিবিড় আর নির্ভয় যোগ্য বন্ধু।বিশেষ ক’রে তাঁর গান আমাদের ব্যক্তি জীবনের সব না পাওয়ার বেদনা ভুলিয়ে দেয়।জীবনের ঊষর মরুভূমিতে বারি সিঞ্চন করে,আমাদের প্রাণের ‘পরে বসন্তের বাতাস টুকুর মত বয়ে যায় ।

তাঁর গানই আমাদের এই ভোগবাদী আত্মসর্বস্ব জীবন থেকে কিছুটা সময়ের জন্য হলেও রেহাই দেয়।আমাদের ভেতর গুনগুনিয়ে ওঠে সেই সুর-‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে।’ আমাদের অনেকেরই তো এরকম অভ্যেস আছে যে কোনও কিছুই ভালো লাগছে না, যেন এক বিপন্ন মুহূর্তে বসে আছি তখন আমরা আমাদের প্রিয় তাঁর গানগুলি শুনতে থাকি।আর সেই গান তখন আমাদের ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়ে যেন একটা উপশমের প্রলেপ দিয়ে দেয়।আমরা কিছুতা ঝরঝরে হয়ে উঠি ।তখন বলতে ইচ্ছে করে-‘বিরস দিন বিরল কাজ,প্রবল বিদ্রোহে/এসেছ প্রেম এসেছ আজ কী মহা সমারোহে।’

এই প্রেম শব্দের গভীর ব্যঞ্জনা তিনি যেভাবে ভুবনময় ছড়িয়ে দিয়েছেন তা দেখে আমরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই ।তাঁর গানে প্রেমের যে ব্যাপ্তি আছে তেমনটি আর কোথাও পাইনা।’তোমার আমার এই বিরহের অন্তরালে /কত আর সেতু বাঁধি সুরে সুরে তালে তালে।’এই সেতু বাঁধার কাজ আমাদের সারাজীবনই চলতে থাকে।হয়তো শেষ পর্যন্ত বাঁধা হয় না।বাঁধা হয়না বলেই আমাদের অন্তরের গভীরে উচ্চারিত হয় এই বানী-‘আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই, বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে।’

এই বঞ্চনার এক্তি গভীর তাৎপর্যময় দিক আছে, সেই দিকটি হ’ল ইতিবাচক।এই বঞ্চনা আছে বলেই আমরা বেঁচে আছি।আর অই যে তিনি সেতু বাঁধার কথা বলেছেন তা যদি একসময় শেষ হয়ে যায় তাহলে তো সেতু বাঁধার জন্য আকুলি-বিকুলির অবসান হবে।’হৃদয়ে হৃদয়ে আধো পরিচয়/আধখানি কথা সাঙ্গ নাহি হয়।’ 

সাঙ্গ হয়ে গেলে তো বেঁচে থাকাটাই অর্থহীন হয়ে পড়বে।খুব ব্যাপক অর্থে প্রেম শব্দটিকে ব্যবহার করলে আমরা বুঝতে পারব এটা আমাদের জীবনে অনেকটা acceleration-এর মত কাজ করে।অর্থাৎ জীবনের গতি ত্বরান্বিত করে।ওই যে কথায় বলে না প্রেমই জীবন আর প্রেমহীনতায় মৃত্যু ।এ শুধু এক অতল জলের আহ্বান আবার কখনও বা রক্তিম মরীচিকা ।তবু রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ‘আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর তোমার প্রেম হত যে মিছে।’ যে কথাটি বলব তোমায় বলে কাটল জীবন নীরব চোখের জলে।কথাটা বলতে পারিনা বলেই তো এত ছটফটানি ।রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় বলেছেন -‘-আমাদের জানা দু-রকমের । 


একটা হচ্ছে জ্ঞানে আর একটা অনুভবে।তাঁর গানের কথা দিয়েই বলি-‘অনুভবে জেনেছিলেম।’কাজেই রবীন্দ্রনাথের গানে ‘প্রেম’-এর যে বিস্তার আছে তা অনুভবে জানতে হয়। এই প্রেম হল যাকে আমরা পেতে চাই তার জন্য এক ধরনের ছটফটানি ।হতে পারেন তিনি ঈশ্বর, হতে পারেন কোনও মানুষ ( পুরুষ অথবা নারী) আবার হতে পারে আমাদের ‘ছোটো
আমি’থেকে ‘বড় আমি’র দিকে যাওয়ার জন্য অনন্ত অভিসার।এই কথা শিল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ।

যা আমি সৃষ্টি করতে চাই তা কিছুতেই পারছিনা। ‘তোমাতে আমাতে হয়নি যে কথা মরমে আমার আছে সে বারতা।’ এই বারতা থেকেই যায় ,কথা হয় না। আর আমাদের এই না বলা বানীর ঘনযামিনীর মাঝে তোমার ভাবনা তারার মত বাজে।এই তুমি যে কে সেটাও আমরা অনেক সময় বুঝতে পারিনা।’ যে ছিল আমার স্বপনচারিণী/তারে বুঝিতে পারি নি।’ বিশেষ ক’রে তাঁর প্রেম ও পুজা পর্যায়ের গানগুলি শুনলে এই কথাটাই মনে হয়।যদিও আমরা অনেকেই রবীন্দ্রনাথের গানকে কোনও পর্যায়ে ফেলে ভাবতে চাই না কারণ তাতে রসাস্বাদনে বিঘ্ন ঘটে ।

আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, শুধাইল না কেহ। শুধাইনি কেউ বলেই তো এত সৃষ্টি ।ছবি,গান, কবিতা । এখানেই সব মরমের কথা বলে যেতে হয়।আর এই প্রেমের জন্যই আমরা ‘দুয়ারে এঁকেছি রক্ত রেখায় পদ্মআসন ।হয়তো এই প্রেম ক্ষনিকের অতিথি হয়ে আসে আবার হারিয়ে যায় । হারাই- হারাই সদা হয় ভয় , হারাইয়া ফেলি চকিতে।মন কে তখন প্রবোধ দিই এই বলে-যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে রইব কত আর?


জীবনে আমরা অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত থাকি,আবার এমন অনেক কিছু অযাচিতভাবে পেয়ে যাই যা কখনও চাইনি।এই চাওয়া পাওয়ার জগতেই হঠাৎ ক’রেই মনে পড়ে যায় সেই গান-অনেক পাওয়ার মাঝে মাঝে কবে কখন একটুখানি পাওয়া/সেই টুকুতেই জাগায় দখিন হাওয়া।’ হ্যাঁ, এই সেই হাওয়া যাকে আমরা বলতে পারি-আমার প্রাণের পরে চলে গেল কে/বসন্তের বাতাস টুকুর মতো ।জীবনে এই বসন্ত বাতাসের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম । এই বাতাস যখন আমাদের প্রাণের পরে বয়ে যায় তখন আপন মনে গুনগুন ক’রে উঠি -এই লভিনু সঙ্গ তব’ সুন্দর হে সুন্দর ।

এই সুন্দর প্রকৃতি হতে পারে ,আবার মানুষও হতে পারে।এই সুন্দরের আকাঙ্খা আমাদের সকলের জীবনেই থাকে। এই সুন্দর নানা বেশে নানা ছলে আমাদের কাছে আসে আমরা অনেক সময় তা টের পাই না।যখন টের পাই’সে তখন স্বপ্ন কায়াবিহীন/নিশীথ তিমিরে বিলীন।তখন ভিতরের আমি বলতে থাকে-‘আমার মন যখন জাগলি না রে/ও তোর মনের মানুষ এলো দ্বারে/তার চলে যাওয়ার শব্দ শুনে ও তোর ভাঙ্গল রে ঘুম/ও তোর ভাঙ্গল ড়ে ঘূম অন্ধকারে ।’তারপর শুরু হয় আবার প্রতীক্ষার পালা- আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ/ খেলে যায় রৌদ্র ছায়া,বর্ষা আসে বসন্ত।’ 

রবিন্দ্রনাথের লেখা থেকেই আমরা জানতে পারি যে তিনি গান লিখে সব থেকে বেশি আনন্দ পেতেন ।আর একথাও তো সত্যি যে আমরা অনেকেই তাঁর গান ছাড়া তাঁকে ভাবতে পারি না।গানের ভিতর দিয়ে যখন দেখি ভুবনখানি /তখন তারে চিনি আমি,তখন তারে জানি।আমাদের জীবনের বিভিন্ন মুহূর্তে আমরা তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়,দাঁড়াতে হয় ।প্রতিদিন আমি ,হে জীবনস্বামী, দাঁড়াব তোমারি সম্মুখে/করি জোড় কর, হে ভুবনেশ্বর,দাঁড়াব তোমারি সম্মুখে ।

তিনি তাঁর গানে অধরা মাধুরীকে ছন্দোবন্ধনে ধরে আমাদের যা উপহার দিয়েছেন তা হ’ল মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ অনুভূতি ‘প্রেম’-এর স্বাদ।জীবন কে প্রগাঢ় ভাবে ভালোবাসার নামই তো প্রেম।এই প্রেম ছাড়া আমাদেরর জীবন অচল।তিনি আমাদের অধিকাংশ বাঙালির জীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন,সেটা আমরা স্বীকার করি আর নাই করি তাতে কিছু যায় আসে না। অই যেমন সূর্যের আলো ।

প্রকৃতির বাতাস যাদের আমাদের স্বীকার -অস্বীকারের দলাচলে এসে দাঁড়াতে হয় না,থিক তেমনি রবীন্দ্রনাথ। আমরা কোনোভাবেই তাঁর মৃত্যুর এত বছর পরেও তাঁকে এড়িয়ে চলতে পারি না।এই মানুষটিকে নিয়ে আমাদের বিস্ময়ের অন্ত নেই।’বড় বিস্ময় লাগে হেরি তোমারে/ কোথা হতে এলে তুমি হৃদি মাঝারে।’




_________________

Post a Comment